সর্বশেষ
সোমবার ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৯ নভেম্বর ২০১৮

যেভাবে সৃষ্টি হয়েছে সৌরজগতের

রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০১৬

647494788_1480836349.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :
আমাদের বাসস্থান পৃথিবী বা আর্থ সূর্যের চারদিকে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে নিজের চারদিকেও ঘুরছে। সূর্যের চারদিকে ঘুরতে এর সময় লাগে ৩৬৫ দিন আর নিজের অক্ষের চারিদিকে ঘুরতে সময় লাগে মাত্র ২৪ ঘণ্টা।

কিন্তু সুপ্রাচীন কাল থেকেই সূর্যকে নিয়ে অনেক ধারণা প্রচলিত। প্রাচীনকালে কেউ বলত সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছে আবার কেউ বলত পৃথিবী ঘুরছে সূর্যের চারিদিকে। কে কাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এর মূল রহস্য বের হতে বেশ সময় লেগেছে।

মোটামুটি কে কাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এটা আবিষ্কার করার আগ পর্যন্ত মানুষের কাছে সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কিত ধারণা ছিল প্রাথমিকের থেকেও একদম নবিশি পর্যায়ে। অনেকেই বলত সকল তারকা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘরে। কিন্তু যখন থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ‘পৃথিবী ঘুরছে সূর্যের চারদিকে’ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল, তখন থেকে সৌরজগৎ নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন ধরনের আলোড়ন ধীরে ধীরে পুঞ্জিভুত হতে শুরু করে।

আর এসময় থেকেই সৌরজগৎ সৃষ্টি কিভাবে হল এটা নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দাড় করান। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই রহস্য নিয়ে এক মতে উপনীত হলেও সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে গেলে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বেশ কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতবাদও জানার প্রয়োজন রয়েছে। এতে করে এই সম্পর্কে খুব সহজেই পরিস্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সৌরজগতের জন্ম-রহস্য সম্পর্কে ফরাসি গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী পিয়েরে লাপ্লাস সর্বপ্রথম ১৭৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মাথা ঘামান। সে সময়ে এই সৃষ্টি সম্পর্কিত তার মতবাদটি বেশ প্রচারিত হতে দেখা যায়। যদিও এর আগে ১৭৫৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কান্ট ও অনেকটা একই ধরনের মতবাদ প্রচার করেন। তবে লাপ্লাসের মতবাদটি প্রচারিত হওয়ার পর দুই মতবাদের মিশ্রণরূপ বিশদভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সমর্থন পায়। যে কারণে সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কিত এই তত্ত্বটিকে কান্ট-লাপ্লাস নীহারিকাবাদও বলা হয়।

নক্ষত্রের সৃষ্টি তত্ত্বে বিজ্ঞানীদের ধারণা নক্ষত্রের সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় মধ্যে সৌরজগৎ সৃষ্টি। তাদের তত্ত্ব অনুসারে সূর্যের আদি বস্তুপুঞ্জের উত্তপ্ত নীহারিকা থেকেই সৌরজগতের সৃষ্টি।

এই তত্ত্ব অনুসারে- বিশাল হালকা গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জ ঘূর্ণিতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় মাঝখানের ঘন বস্তুপিণ্ডটি আদি সূর্যের আকারে রূপ নেয়। এরপর গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জ ক্রমে ঠাণ্ডা হতে শুরু করে এবং সঙ্কুচিত বস্তুপুঞ্জের আকারে ছোট হয়ে আসে। ফলে কৌণিক ভরবেগের নিত্যটা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য ঘোরার বেগ বাড়তে থাকে এবং প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকায় নীহারিকাপুঞ্জ মসুরদানার মতো কিছুটা চ্যাপ্টা আকারের হয়ে দাড়ায়, আর ঘোরার বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তার বিষুব অঞ্চলের কেন্দ্রাতিগ শক্তি বৃদ্ধি পায়।

এই কেন্দ্রাতিগ শক্তি কেন্দ্রাভিগ মহাকর্ষের সমান হয়ে দাঁড়ানোর পর বাইরের একটি খোলস সংকোচনশীল বস্তুপুঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে তারপর আরো সঙ্কচনের ফলে অনুরুপভাবে পর পর বস্তুপুঞ্জের আরো কিছু খোলস পৃথক হয়ে যায়। এই খোলসগুলো পরে ঠাণ্ডা হয়ে জমাট বাঁধতে শুরু করে আর তাদের আগেকার ঘূর্ণনের ফলেই এরা গোলাকৃতি লাভ করে। এসব গোলাকৃতি সঙ্কুচিত বস্তুপিণ্ড অবশেষে সূর্যের চারদিকে গ্রহ উপগ্রহের রূপ লাভ করে।

উনিশ শতকের শেষদিক পর্যন্ত লাপ্লাসের এই মতবাদই ছিল সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে প্রধান মতবাদ। কিন্তু ক্রমেই এই মতবাদের দুর্বল দিকগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে ধরা পড়তে শুরু করে। যেমন লাপ্লাসের হিসেবে সূর্যের চারিদিকে ঘুরন্ত গ্যাসপুঞ্জের মধ্যে যেকোনো ব্যাসার্ধরেখায় বস্তুকণার আপেক্ষিক স্থানচ্যুতি ধরা হয়নি। গাণিতিক দিক থেকে ভৌত বাস্তবতার বিবেচনায়, এ ত্রুটির কারণেই লাপ্লাস বাইরের দিকের গ্যাসকণা আর ভেতরের দিকের গ্যাসকণার তুলনামূলক গতির বিষয়টি সম্পর্কে ভুল ধারণা করেছিলেন। লাপ্লাসের ধারণা সত্যি হলে সবগুলো গ্রহ উপগ্রহই তাদে কক্ষপথে ঘোরার সময় নিজের অক্ষের ওপর সামনের দিকে ঘুরবে আর উপগ্রহরা তাদের চলার বেগ পাবে প্রধাণত গ্রহের ঘোরার বেগ থেকে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলগ্রহ নিজের অক্ষের চারিপাশে যে বেগে ঘরে তার উপগ্রহ ফোবস মঙ্গলের চারপাশে ঘরে তার তিনগুণ বেগে। ইউরেনাসের উপগ্রহরা তার চারপাশে ঘরে সামনের বা পেছনের দিকে নয়, কক্ষের সাথে সমকোণে। আবার নেপচুন বৃহস্পতি ও শনির কোনো কোনো উপগ্রহ ঘরে উল্টো দিকে, অর্থাৎ গ্রহ ঘোরার বিপরীত দিকে। তাছাড়া কেন্দ্রাতিগ শক্তির টানে সূর্য থেকে বস্তুপুঞ্জ বের হয়ে যাওয়ার জন্য সূর্যের চারপাশে তাদের ঘোরার বেগ আজকের তুলনায় বহুগুণ বেশি হওয়ার কথা কিন্তু এই গতি তাদের কখনোই ছিল না।

এইসব বিভিন্ন দুর্বল দিক ধরা পড়ায় লাপ্লাস-কান্ট মতবাদটি তার জনপ্রিয়তা হারায়। ব্রিটিশ গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী জেমস জিনস ১৮১৬ সালে লাপ্লাসের তত্ত্বটি খন্ডন করে সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তার মতে, দূর অতীতে সূর্যের তুলনায় অনেক বড় একটি নক্ষত্র সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার আকর্ষণের সূর্যের বস্তুপুঞ্জের সামান্য একটি অংশ (সমগ্র সৌরজগতে সর্বমোট যে পরিমান বস্তু আছে তার ৯৯.৮৭ শতাংশ রয়েছে সূর্যে, আর মাত্র ০০.৩ শতাংশ রয়েছে সৌরজগতের বাকি সব সৃষ্টিতে, সুতরাং একে সামান্য বলা চলে) খণ্ড খণ্ড আকারে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছন্ন বাষ্পীয় অংশটি পড়ে ধীরে ধীরে শীতল হয়ে জমাট বেঁধে গ্রহ উপগ্রহে পরিণত হয়।

কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তত্ত্বটি তার প্রাণ হারায় কারণ সূর্যের দেহ থেকে যদি বস্তুপুঞ্জ ছিটকে গিয়েই থাকে তাহলে তাদের তো সূর্যের কাছেই থাকার কথা, বাস্তবে সূর্যের যা ব্যস তার তুলনায় বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৫০০ গুণ আর নেপচুনের ৩০০০ গুণ আর আমাদের ছায়াপথ গালাক্সিতে ১০০ কোটি নক্ষত্রের একটি করে গ্রহমণ্ডল রয়েছে আমাদের সৌরজগতের মতোই সুতরাং এই বিরল ঘটনা সবার ক্ষেত্রেই ঘটে গ্রহ উপগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব না। যে কারণে জিনসের তত্ত্বটি আর টেকেনি।

এরপর ১৯৪৩-৪৪ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ফোন ভাইতস্কার ও সোভিয়েত গণিতবিদ অটোশিট প্রায় একই সময়ে পৃথক পৃথকভাবে একই ধরনের মতবাদ প্রচার করেন। বহু পরীক্ষানিরীক্ষার পর সৌরজগতের সৃষ্টি সম্পর্কে তাদের মতবাদটি বর্তমানে প্রমাণিত এবং সু-প্রতিষ্ঠিত। তাদের দুজনেরই মতে- সম্ভবত শীতল গ্যাসপুঞ্জ ও ধূলিকণা সমন্বিত এক নীহারিকা থেকেই আদিকালে সৌরজগতের উৎপত্তি হয়েছিল। এদিক থেকে তত্ত্বটি লাপ্লাসের তত্ত্বের সংশোধিত রূপ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই তত্ত্বটি সৌরজগতকে সম্পূর্ণ যুক্তিতর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নানা দেশের আরো অনেক বিজ্ঞানী এই মতের সমর্থন করেন এবং নানাভাবে এই মতটির বিকাশ সাধন করেন।

তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন, মার্কিন জ্যোতির্বিদ জিরাড কয়পার, রসায়নবিদ হ্যারল্ড উরে, ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েল, প্রখ্যাত সুইডিশ পদার্থবিদ হান্স আলফভিন। বলা চলে খুতিনাটি বিষয়ে কমবেশি মতপার্থক্য থাকলেও বিজ্ঞানীরা এই মতবাদকে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকার করেছেন।

এই মত অনুসারে সৌরজগতের সৃষ্টি হয়েছে শীতল আদি বস্তুকনিকাপুঞ্জ থেকে। নিরন্তর গতিশীল বস্তুকণা এই বিশাল গ্যাসীয় সমাবেশ সৃষ্টি করেছিল ছোট বড় নানা আকারের অসংখ্য ঘূর্ণি বা আবর্ত। সবচেয়ে বড় ঘূর্ণিটিতে বস্তুকনিকা সংহত ও একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় আদি সূর্যের কেদ্রস্থল। এবং এক কেন্দ্রের চারপাশে বস্তুকণা জড় হয়ে গড়ে তোলা নানা আকারের শীতল আদি গ্রহপিণ্ড। শীতল সূর্যে সংকোচন ও তেজময় বিকিরণ অর্থাৎ হাইড্রোজেন ভেঙ্গে হিলিয়াম তৈরি সময় আলো তৈরি হয়েছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণনের সময় তৈরি হয়েছে প্রচুর তাপ। যার ফলে সূর্যের অন্য গ্রহগুলো উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। এবং যে ঘূর্ণিগুলো থেকে গ্রহ সৃষ্টি হয়ে সেগুলোর মূল ঘূর্ণির বাইরেও ক্ষুদ্র ঘূর্ণি থাকায় সেগুলো থেকে উপগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

আর সূর্যের কাছে থাকার ফলে তাপ বেশি পাওয়া এবং সূর্য যখন তাপ বিকিরণ করতে শুরু করে তখন সূর্যের ছাড়া পাওয়া শক্তি ও পদার্থকণা এক বিপুল শক্তিশালী সৌরবায়ুর সৃষ্টি করেছিল যার প্রভাবে গ্রহগুলোর উপরিভাগ থেকে হাইড্রোজেন সহ বিভিন্ন হালকা গ্যাস আরো ঘন হয়ে যায়। এর তাপ ও সৌরবায়ুর ফলেই সূর্যের কাছের গ্রহ বুধ, শুক্র,পৃথিবী ও মঙ্গলের ঘনত্ব বেশী এবং তারা পাথুরে। অন্যদিকে বৃহস্পতি,শনি, ইউরেনাস, নেপচুনের ঘনত্ব কম এবং তারা গ্যাসীয়।

এই মতে বলা হয়- প্রাথমিকভাবে নীহারিকার ঘূর্ণি থেকে সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ তৈরি হওয়ার পর সূর্যের আকর্ষণে এরা ক্রমানুসারে সূর্যের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে এবং যে যত কাছে আসে তত উত্তপ্ত হতে থাকে। এই উত্তাপের ফলে গ্রহগুলো আয়নিত হয়ে যায় এবং বৈদ্যুতিক বিকর্ষণের ফলে সূর্য থেকে প্রতিহত হয়ে ভর ও ব্যাসার্ধ অনুসারে প্রত্যেকে একটি নির্দিষ্টই সীমানায় গিয়ে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এবং নিজের দিকে ঘূর্ণি থেকে নিজের দিকে ঘোরার শক্তির পাশাপাশি সূর্যের দিকে ঘোরা শুরু করায় একটি স্থিতিশীল ঘূর্ণনঅবস্থা প্রাপ্ত হয়। উপগ্রহের ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনা ঘটে। তারা সূর্য থেকে গ্রহের গ্রহণ করা তাপের কারণে বিকশিত হয়ে নির্দিষ্ট সীমানায় ঘুরতে থাকে। এর ফলে নিয়মিত একটি স্থানকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণয়মান একটি জগতের সৃষ্টি হয়। যাকে সৌরজগৎ বলা হয়। কোন ছায়াপথের প্রায় এক লক্ষ তারকার মধ্যে অন্তত এমন একটি তারকা পাওয়া যায় যার এমন একটি করে জগত রয়েছে। আমাদের সূর্যের নাম অনুসারে সূর্যের এই জগতের নাম দেওয়া হয়েছে সৌরজগৎ।

ঢাকা, রবিবার, ডিসেম্বর ৪, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ২২২৩ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন