সর্বশেষ
বুধবার ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ২১ নভেম্বর ২০১৮

সবুজ চোখের শরবতের জীবনের নানা মোড়!

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৭

347546872_1484644686.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
সবুজ চোখের ‘আফগান গার্ল’ শরবত গুলা এখন নিজের দেশেই আছেন। এক ছেলে আর তিন মেয়েকে নিয়ে নিজের দেশ আফগানিস্তানে নতুন জীবন শুরু করেছেন।

চেষ্টা করছেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার। ৪০ পার হওয়া শরবত গুলা এখন অনেকটাই অসুস্থ। অনেক ঝড়ঝাপ্টা এসেছে জীবনে। সেসব সামলাতে গিয়ে মানসিক দৃঢ়তা এসেছে। তাই তার বিখ্যাত সবুজ চোখে এখনো ম্লান হয়নি সেই ঔজ্জ্বল্য। চোখজুড়ে আছে স্বপ্ন, আছে নিরাশাও।

১৯৮৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাময়িকীর প্রচ্ছদে আলোকচিত্রী স্টিভ ম্যাককারির তোলা সবুজ চোখের শরবতের ছবি প্রকাশ হয়। বিশ্বজুড়ে প্রচার পান তিনি। বিবর্ণ পোশাক ও ধুলোমাখা ক্লান্ত মুখে শরবতের সবুজ চোখের মর্মভেদী দৃষ্টি ছবিটিকে পরিচিত করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের আলোকচিত্রী স্টিভ ম্যাককারি ১৯৮৪ সালে পেশোয়ারের কাছাকাছি এক শরণার্থীশিবির থেকে শরবত গুলার ছবি তোলেন। ওই সময় শরবত ছিলেন ১২ বছরের বালিকা। অনেক দিন পর ২০০২ সালে স্টিভ ম্যাককারি আবার খুঁজে পান তাকে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাময়িকীর প্রচ্ছদে শরবত গুলা। ছবি: রয়টার্স
আলোকচিত্রী স্টিভ বলেছিলেন, শরবতের চোখের দৃষ্টি তখনো ছিল সেই আগের মতো তীক্ষ্ণ। ‘আফগান যুদ্ধের মোনালিসা’ বলেও ডাকা হয়েছে এই নারীকে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সাময়িকীর প্রচ্ছদে শরবত গুলা। ১৭ বছর ধরে নিজের ছবি এত বিখ্যাত হয়েছে জানতেন না শরবত। যখন জানলেন, তখন জাল পাকিস্তানি পরিচয়পত্র রাখার কারণে আটক হলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এফআইএ) ২৬ অক্টোবর শরবতকে গ্রেপ্তার করে। দুই সপ্তাহ পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর তাকে বহিষ্কার করে পাকিস্তান।

কাবুলে নিজের অস্থায়ী বাড়িতে বসে শরবত গুলা পাকিস্তানে কাটানো সময়ের কথা ভাবছিলেন। বললেন, সেখানে সময়টা ভালোই কেটেছিল। প্রতিবেশীরা ভালো ছিল। কখনো ভাবেননি ৩৫ বছর কাটানোর পরও পাকিস্তান সরকার এমন আচরণ করবেন।

পাকিস্তানের দুঃসময়ের কথা বলতে গিয়ে শরবত বলেন, সে দেশের সরকার ২০ লাখ আফগান শরণার্থীকে বসবাসের অনুমতি দিয়েছে। জাল পরিচয়পত্রের কারণে তাকে আটক করা হয়। পুলিশকে বলেছিলেন, দুই কারণে ওই পরিচয়পত্র করেছিলেন। প্রথমত, শিশুদের শিক্ষাদান। দ্বিতীয়ত, নিজের বাড়ি বিক্রি। জাল পরিচয়পত্র রাখার অপরাধে শরবত গুলাকে ১৫ দিন কারাগারে থাকতে হয়। প্রথম সপ্তাহ কারাগারে ও দ্বিতীয় সপ্তাহে হাসপাতালে থাকেন তিনি। জানালেন, সেটি তার জীবনের কঠিন ও খারাপ সময় ছিল।

শরবত গুলার ভাষ্য, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পাকিস্তান বহিষ্কার করে তাকে। পরে অবশ্য আবার পাকিস্তানেই থাকতে বলে। কিন্তু শরবত বলেন, যথেষ্ট হয়েছে। তিনি নিজের দেশে চলে যাবেন। ৩৫ বছর থাকার পরও পাকিস্তান সরকারের এমন আচরণ তিনি মেনে নিতে পারেননি।

পাকিস্তানের সঙ্গে শরবত গুলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তার স্বামী ও বড় মেয়ে পেশোয়ারে মারা গেছেন। সেখানেই নিজেদের বাড়ির সামনে তাদের কবর দেয়া হয়। যদি কখনো পাকিস্তানে যান, তাহলে শুধু স্বামী ও সন্তানের কবরে দোয়া করতে যাবেন।

যে ছবি তাকে বিখ্যাত করেছিল, তা প্রথম তিনি দেখেন ভাইয়ের কাছে। শরবত গুলা বলেন, সে সময় খুব অবাক হয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি তুলতে পছন্দ করতেন না। নিজের ছবির এত প্রচারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে যখন দেখলেন তার সেই ছবিই অনেক শরণার্থীর জীবনকে তুলে এনেছে। তখন খুশি হয়েছিলেন। তার এক ভাই ও এক বোনের চোখও সবুজ। শরবত গুলা জানান, তার নানিরও চোখের রং সবুজ। তিনি মারা গেছেন।

১৯৭৯‍ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় শরবত গুলা দেশ ছাড়েন। মা আগেই মারা গিয়েছিলেন। বাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে পাকিস্তানের পেশোয়ারে কাচা গারাহি এলাকায় শরণার্থীশিবিরে বসবাস শুরু করেন।

১৩ বছর বয়সে শরবত গুলার বিয়ে হয় রহমত গুলের সঙ্গে। পাঁচ বছর আগে স্বামী মারা যান। তিন বছর আগে ২২ বছর বয়সে মারা যান শরবতের বড় মেয়ে। দুজনেই হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
আলোকচিত্রী স্টিভ ম্যাককারির সঙ্গে ১৭ বছর আগের ও পরের শরবত গুলা। ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তানে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়ে আশরাফ ঘানির সঙ্গে দেখা করেছেন শরবত। সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও তার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। আর্থিক সহায়তা ও বাড়ি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

শরবত চান সন্তানেরা শিক্ষিত হোক। সুখী জীবন কাটাক। কেবল নিজের সন্তানদের কথাই ভাবেন না শরবত। গরিব, অনাথ ও বিধবাদের জন্য দাতব্য সংস্থা অথবা হাসপাতাল গড়তে চান। তিনি চান, আফগানিস্তানে শান্তিতে থাকুক।

সূত্র: বিবিসি

ঢাকা, মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ১৯৫২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন