সর্বশেষ
বুধবার ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ২১ নভেম্বর ২০১৮

তার চেয়ে তার ছায়া বড়

শনিবার, জুলাই ২২, ২০১৭

1496923190_1500726404.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
চিকন পিনের চার্জার একটি নাটকের নাম। নির্মাতা হুমায়ূন সাধু। গেল ঈদে টিভিতে দেখানোর পর থেকেই আলোচনা চলছে। লোকে বলছে, মানুষটা ছোট, কিন্তু কাজ করেছে বড়। যারা তখন দেখেননি তারা এখন দেখছেন ইউটিউবে। প্রায় পাঁচ লাখবার ভিউ হয়েছে নাটকটি। এ বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন তিনি।

পাড়ার লোকেরা বলত—আস্ত একটা ফুটবল টিম! সাধুরা ১০ ভাই-বোন। তিনি ৭ নম্বর। ভাই-বোনদের সবাই বেশ লম্বা-চওড়া। এক বোনই তো প্রায় ৬ ফুট উঁচু। শুধু হুমায়ূন কবীরই আলাদা। ছোটমোটো। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে তাদের বাসা।

টিভির কলকবজা ঠিক করতে পারতেন-
বাড়িতে একটিমাত্র টিভি ছিল। সাদা-কালো। বাবার রুমে। শুধু শুক্রবারেই টিভি দেখার সুযোগ মিলত। বেশি কথাবার্তা বলা চলত না। ব্যতিক্রম ছিল হুমায়ূন আহমেদের নাটকের বেলায়। ‘কোথাও কেউ নেই’ একসঙ্গে সবাই মিলে জমিয়ে দেখেছে। যে চরিত্র ভালো লাগত তার খুব প্রশংসা। আর ভিলেনগুলোকে ধুয়ে সাফ। হুমায়ূন অবশ্য বেশি বলতেন না, তবে ভাবতেন বসে, ওই চরিত্রটাকে যদি এই চরিত্রে বদলে দেওয়া যেত কেমন হতো বা বাকের ভাইয়ের হাতে চেইন না দিয়ে রিভলবার দিলে কেমন হতো? বাবা বাসায় না থাকলে বাবার ঘরেই বেশি সময় কাটাতেন হুমায়ূন। টিভি খুলে কলকবজা দেখতেন। একসময় নষ্ট টিভি ঠিক করতেও শিখে গিয়েছিলেন।

বড় আপু পড়িয়েছেন-
অন্য দশটি বাচ্চার মতো তো নয় হুমায়ূন। বাবা স্কুলে পাঠাতে চাইছিলেন না। বড় আপু বাসায় পড়াতেন অল্পস্বল্প। তারপর বড় আপুই বাবাকে বলে-কয়ে একদিন পাঠালেন স্কুলে। কিন্তু স্যারেরা নেবেন না। এদিকে হুমায়ূনের বড় ভাই সাইফুল কবীর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিকসের ছাত্র। তিনিই আবার স্কুলে নিয়ে গেলেন। শিক্ষকরা রাজি হলেন না। ভাই বললেন, ‘ওকে একটা সুযোগ দিন। প্রথম সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত দেখেন। ভালো না করলে রাইখ্যেন না।’ ক্লাস টুতে সেবার ১৩০ জন ছেলে-মেয়েকে পেছনে ফেলে প্রথম হন হুমায়ূন। সহপাঠীরা তখন হুমায়ূনকে কাঁধে নিয়ে উল্লাস করেছিল। মিষ্টি কিনে খাইয়েছিল পাড়ার লোকদের।

কলেজে গিয়ে স্বাধীন-
হুমায়ূন পত্রিকায় ছদ্মনামে লেখা পাঠাতেন। ‘অমর বই ঘর’ থেকে ভাড়ায় এনে বই পড়তেন। বাবা এসব পছন্দ করতেন না। পরীক্ষার সময় ১৪৪ ধারা! টিভি দেখা, খেলতে যাওয়া, আড্ডা মারা—সব বন্ধ। যা-ই হোক ম্যাট্রিক পাসের পর নাসিরাবাদের একটি কলেজে ভর্তি হলেন। জীবনে স্বাধীনতা এলো। এখন মন চাইলে সিনেমা দেখতে পারেন, শুনতে পারেন গান। এইচএসসির রেজাল্ট ভালো হলো না বেশি। তবে এর মধ্যে সিনেমা দেখা হয়ে গেছে অনেক। ভালো ফল নেই, তাই পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ হলো না। ভর্তি হলেন একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্পিউটার স্টাডিজ নিয়ে পড়তে থাকলেন।   

জাবিদ আহসানের সঙ্গে জমেছিল-
ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষক জাবিদ আহসান। সিনেমা, মিউজিক নিয়ে তার ইন্টারেস্ট ছিল। হুমায়ূনেরও ওই দিকে ঝোঁক। তাই দুজনের ভালো জমে গিয়েছিল। সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতেই বেশি ভালো লাগত হুমায়ূনের। কিন্তু টাকা খরচ হতো বেশি। বাসার কাছে একটা সাইবার ক্যাফে ছিল। সেখানে গিয়ে নেট চালাতেন। ফিল্ম ক্লাবগুলো চট্টগ্রাম শহরের কোথায় কোথায় ছবি দেখাচ্ছে তার খবর নিতেন। সে রকমই কোনো কোনো প্রদর্শনীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের কর্মীদের সঙ্গে পরিচয়। সংসদের সদস্য হওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে অনেক দরবার করেছেন। কিন্তু তারা দোহাই দিয়েছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে হবে।

তবু লেগেই ছিলেন-
একসময় যোগাযোগ হলো চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের (সিএফসি) সঙ্গে। ২০০০ সালের দিকে এই সংগঠনের সদস্যপদ পান। ওই বছরই সিএফসিতে একটি কর্মশালায় অতিথি হয়ে যান নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। টিভিতে তখন ফারুকীর সিক্সটি নাইন নাটকটি প্রচারিত হচ্ছিল। নাটকের একেবারে শেষে পর্দায় ফারুকীর মেইল আইডিসহ নাম ভেসে উঠত। সেখান থেকে মেইল আইডি নিয়ে আগে বেশ কয়েকবার ফারুকীকে মেইলও করেছিলেন। এবার একেবারে সামনা সামনি দেখা পেলেন। কর্মশালায় মন্ত্রমুগ্ধের মতো ফারুকীর বক্তব্য শুনেছিলেন। কিন্তু কোনো আলাপ হয়নি। পরে দোকান থেকে একদিন সাহস করে ফারুকীর নম্বরে ফোন দিলেন। বললেন, ‘আপনার নাটক ভালো লাগে।’ ‘ধন্যবাদ!’ সেদিন আলাপ আর বেশিদূর এগোয়নি। এরপর মাঝেমধ্যেই ফোন দিতেন।

তখন বই পড়তেন-
হুমায়ূনের বন্ধুরা যখন ধুমছে ডেটিং করে বেড়াতেন, তখন তিনি বই পড়তেন। তত দিনে মার্ক্স-এঙ্গেলসও পড়া হয়ে গেছে। হুমায়ুন আজাদ থেকে হুমায়ূন আহমেদ— সমকালীন প্রায় সব লেখক। চাকরির জন্য দৌড়ঝাঁপও করেছেন। কয়েক দিন পাড়ায় একটি সিডি-ক্যাসেটের দোকানে বসেছিলেন।

তারপর এলো ২০০৩ সাল-
ফারুকীকে একদিন ফোন করে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ ‘ঢাকায় আসেন’ বলে মহাখালী ডিওএইচএসের বাসার ঠিকানা দিলেন ফারুকী।

বাসার কাউকে না জানিয়ে একদিন সকালে মহাখালী ডিওএইচএসে হাজির হলেন হুমায়ূন। দোতলা বাসা। ফারুকী ছাড়াও তরুণ নির্মাতাদের অনেকে তখন সেই বাসায় থাকতেন। বাসায় ঢোকার পর জানলেন, ‘বস ঘুমে’। একটু পরে উঠে এলেন ফারুকী। পরিচয় দেওয়ার পর সঙ্গে আনা চকোলেট এগিয়ে দিলেন হুমায়ূন। ফারুকী বললেন, ‘আমি তো চকোলেট খাই না।’ তারপর একটু পরে আবার বললেন, ‘একটা শুটিংয়ে বাইরে যাচ্ছি। যাবেন নাকি?’ খুশিতে গদগদ হুমায়ূন। কিন্তু বাসায় কাউকে না বলে আসায় মনটা খচখচ করছিল। তাই বললেন, ‘বস, বাসায় কাউকে বলে আসিনি। তাই এবার না যাই। সামনের বার এলে যা বলবেন করব।’

ফারুকীর সঙ্গে আবার-
আবার একদিন মহাখালীতে হুমায়ূন। বললেন, ‘বস, আমি চট্টগ্রামের হুমায়ূন। আসছিলাম একবার। মনে আছে?’ বসের (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী) মনে আছে কিন্তু তিনি আগমনের হেতু জানতে চান। হুমায়ূন বললেন ‘কাজ করতে চাই আর কী!’

-কী কাজ করতে চান?

-ফিল্ম মেকিং শিখতে চাই।

-এত কিছু থাকতে আপনি ফিল্ম মেকার হতে চাইলেন কেন?

-পড়াশোনা ভাল্লাগে না। ফিল্ম মেকিং শিখতে চাই।

-শোনেন, এটা বড়ই কঠিন জায়গা। বছরের পর বছর ধৈর্য ধরতে হয়। পারবেন ধৈর্য ধরতে?

-জি পারব।

-উঠছেন কই?

-উঠি নাই এখনো।

-আত্মীয়-স্বজন আছে কেউ ঢাকায়।

-জি না।

তাইলে উঠতে হইব না কোনো জায়গায়। এই যে আমাগো দেখলেন না? এইখানে শুটিং করতাছি, কাজকাম করতাছি, একসঙ্গে সবাইরে দেখতাছেন না? আমরা সবাই এইহানেই খাই, এইহানেই কাম করি। সবাই একসঙ্গে থাকি। আপনিও থাকেন। একটা চিপাচাপা দেইখ্যা ঢুইকা যান।

সাধু হয়ে গেলেন-
ছবিয়ালে একেকজন একেক নামে ডাকা শুরু করল হুমায়ূনকে। শেষমেশ সাধু নামটাই স্থির করা হলো তার জন্য। হুমায়ুন কবীর এখন হুমায়ুন সাধু। ২০০৫ সালের দিকে সহকারী পরিচালকদের কাণ্ডকীর্তি নিয়ে একটা গল্প লিখে ফেললেন হুমায়ূন। নাম এডি (অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর)। সেই গল্পটিকে চিত্রনাট্যে রূপ দেন ফারুকী। নাম ‘ঊন-মানুষ’। এই নাটকের কাহিনির সঙ্গে সাধুর ছবিয়াল পরিবারের সদস্য হওয়ার ঘটনার মিল আছে। নাটকে তিশার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন হুমায়ূন। ২০০৬ সালে এনটিভিতে প্রচারিত হয় নাটকটি। বলছিলেন, তখনো আমার নিজের কোনো ফোন ছিল না। সবাই ওই বসের ফোনেই ফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছিল।’ নাটকের শেষে একটা প্রশ্ন ছিল, ‘দৈর্ঘ্য-প্রস্থে আর কতটুকু হলে একটা মানুষকে মানুষ বলা যায়?’

ক্যাথরিন মাসুদের কর্মশালা-
২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে ক্যাথরিন মাসুদের অধীনে একটা কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন সাধু। তার অংশ হিসেবেই বানিয়েছিলেন একটি শর্টফিল্ম। পরে ‘গড ভার্সেস গড’ নামে আরো একটি শর্টফিল্ম বানিয়েছিলেন। ২০১২ সালে তার পরিচালিত প্রথম নাটক দেখানো হয় টিভিতে। নাটকের নাম ছিল ‘দরশন’। প্রচারিত হয়েছিল বৈশাখী টিভিতে। এখন পর্যন্ত পাঁচটির মতো টিভিনাটক পরিচালনা করেছেন। অভিনয় করেছেন সমানসংখ্যক নাটকে। এ ছাড়া ‘সিজোফ্রেনিয়া’ ও ‘অ-মানুষিক’ নামে দুটি টেলিফিল্মও বানিয়েছেন।

চিকন পিনের চার্জার-
হুমায়ূন সাধুর সর্বশেষ নাটক ‘চিকন পিনের চার্জার’। কাহিনি তার। পরিচালকও তিনি। তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন শাহতাজ। ছবিয়াল রি-ইউনিয়নের অংশ হিসেবে বানিয়েছেন এটি। জীবন থেকে নেওয়া গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কাহিনি এমন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্মার্ট মেয়ের সঙ্গে আলাপসালাপ চলতে থাকে সাধুর। প্রেমই হয়ে যায় একরকম। মেয়েটির সঙ্গে যখন তিনি বাস্তবে দেখা করতে যান তখন মেয়েটি সব কিছু অস্বীকার করে বসে। খুব দুঃখ পান সাধু। পরে তিনি একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হন—মেয়েরা যেমন হ্যান্ডসাম ছেলে পছন্দ করে, ছেলেরাও তো বেঢপ কাউকে গ্রহণ করে না। তাহলে কি এই মানুষগুলো মানুষ নয়?

বাস্তবে যা ঘটেছিল-
সাধুর ‘গড ভার্সেস গড’ শর্টফিল্মটি ভালো লেগেছিল মুম্বাইয়ের এক মেয়ের। মেয়েটার নাম লেখা। দুজনের মধ্যে প্রায়ই ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ হতো। ২০১৫ সালে একবার মুম্বাই গিয়েছিলেন সাধু। গিয়ে পড়লেন বিপদে। কোনো আবাসিক হোটেলে জায়গা পাননি। শুনেছিলেন—‘বাংলাদেশি নট অ্যালাউড!’ ফোন করলেন লেখাকে। বললেন, আমি মুম্বাইতে। হোটেল ম্যানেজ হয়নি। আবার ফোনেরও চার্জ প্রায় শেষ। যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’ লেখা তাকে ম্যাকডোনাল্ডে অপেক্ষা করতে বললেন। এদিকে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। চার্জারও সঙ্গে নেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষার পর লেখা এলো। দেখে যেন বিষম খেল। চিকন পিনের চার্জার নাটকটি এই ঘটনা অবলম্বন করেই লেখা।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

ঢাকা, শনিবার, জুলাই ২২, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ২৮১ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন