সর্বশেষ
মঙ্গলবার ১০ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলিম বিবাহের বিধি বিধান

শনিবার, জুলাই ২৯, ২০১৭

674468067_1501322257.jpg
ফেরদৌস আল হাসান :
সামাজিক রীতি অনুযায়ী বিবাহ মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। মানব মানবীর বিবাহের মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে ওঠে। মানবজাতীর গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধীকার স্বত্ত্ব নির্ধারিত হয়। যুগে যুগে অঞ্চলভেদে গড়ে উঠেছে বিয়ের বহুমাত্রিক নিয়ম কানন।
পৃথিবীর সব ধর্মে বিয়ের নিজস্ব কিছু রীতি-নীতি ঠিক করা আছে। এসব রীতি নীতির সামান্য ব্যত্যয়ে কখনো কখনো মানব মানবীর গুরুত্বপূর্ণ এই সর্ম্পক অবৈধ হয়ে যায়। দেখা দেয় উত্তরাধীকার নিয়ে তুমুল হৈ-চৈ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষপটে আমরা এই কিস্তিতে আলোচনা করব- মুসলিম ও হিন্দু বিবাহের কিছু নিয়ম কানন। আগেই বলে রাখি- রাঙ্গামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজারে বেশ কিছু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বসবাস করতে দেখা যায়। তাদের বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত বিধি বিধানের সাথে হিন্দুদের কোনো তফাৎ নাই। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বেশ কয়েকটি রায়ে বলে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের বৌদ্ধরা হিন্দু পারিবারিক আইন মোতাবেক পরিচালিত হবে।

মুসলিম বিবাহ কি :
মুসলিম শরীয়াহ আইনে বিবাহকে ‘নিকাহ’ বলা হয়। ‘নিকাহ’ শব্দটি আরবি। যার বাংলা অর্থ- বিবাহ, শাদি। হাদিসে আছে- একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নর-নারীর বিয়ে করা ফরজ। যাদের বিয়ে করার সামর্থ নাই তাদের জন্য রোজা রেখে সংযম করার আদেশ দিয়েছেন ইসলামের নবী হযরত মোহম্মদ (সা.)।

মুসলিম বিবাহের শর্ত :
শরিয়াহ মোতাবেক প্রাপ্ত বয়স্ক নর-নারীর মধ্যে বৈধ বিবাহের তিনটি প্রধান শর্ত রয়েছে :-
১। যেকোনো একপক্ষকে বিয়ের প্রস্তাব (ইজাব) দিতে হবে ২। অন্যপক্ষকে প্রস্তাব গ্রহণ (কবুল) করতে হবে ৩। দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। শরিয়াতে আরো কিছু শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যেমন- মোহরানা নির্ধারণ করা। ছেলে মেয়েকে সুস্থ মস্তিস্কের হতে হবে। তবে এই শর্তগুলো গৌণ। এগুলোর অনুপস্থিতিতে বিবাহ অবৈধ হবে না।

মুসলিম বিবাহে ছেলে মেয়ের বয়স :
শরীয়তে পুরুষদের বিয়ের বয়স-বালেগ হওয়া। ইমাম আবু হানিফার মতে ছেলেরা ১২ বছরে বালেগ হয়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে যখন তারা খেয়ারুল বুলুগে পৌঁছায়। ইমাম আবু ইউসুফের মতে মেয়েরা ১৫ বছরে খেয়ারুল বুলুগে পৌঁছায়। কিন্ত শরীয়াতে বিবাহের এই বয়স বাংলাদেশে বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯ অনুযায়ী মেয়েদের ১৮ আর পুরুষদের ২১ বছরের আগে বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিয়ে একবার সম্পন্ন হলে বিয়ে বৈধ হয়ে যাবে। কেবল যে কাজী বিয়ে সম্পাদন করেছে বা ছেলে-মেয়ের অভিভাবকদের শাস্তি পেতে হবে।

মুসলিম বিবাহের নিবন্ধন :
মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন-১৯৭৪ এর ৩ ধারা অনুযায়ী অবশ্যই বিবাহ নিবন্ধন করতে হবে।একই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী বিয়ের সময় কাজী উপস্থিত না থাকলে বিয়ের ৩০ দিনের মধ্য স্বামীকে সংশ্লিষ্ট কাজী অফিসে বিয়ে নিবন্ধন করাতে হবে, না হয় তার দুই বছরের জেল অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। তবে মনে রাখতে হবে, বিযে নিবন্ধন না করার কারণে বিয়ে অবৈধ হবে না।

বাংলাদেশের মুসলিম পুরুষরা সর্বচ্চ কতটি বিয়ে করতে পারে? পবিত্র কোআনের ‘সুরা নেছায়’ আল্লাহ বলেছেন, তোমরা পুরুষরা চারটা পর্য়ন্ত নিকাহ করতে পারব”। কিন্ত বাংলাদেশে ১৯৬১ সালে পুরুষদের বহু বিবাহের একচ্ছত্র অধীকারকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ-১৯৬১ এর ৬ নং ধারা অনুযায়ী কোনো স্বামী যদি তার বর্তমান স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়। স্বামীকে অবশ্য-তার এলাকার সিটি কর্পোরেশন অথবা পৌরসভা মেয়রের কাছে আর গ্রামের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে। চেয়ারম্যান বিবেচনা করে যদি যৌক্তিক মনে করে কেবল তখন-ই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিবে।

তবে উল্লেখ্য যে, চেয়ারম্যান আবেদনকারীর বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে পারমিশন স্বামীকে কোনোভা-ই দিতে পারবে না। স্বামী যদি স্ত্রীর অনুমতি ব্যতীত অথবা চেয়ারম্যান বা মেয়র যদি স্ত্রীর সাথে আলাপ আলোচনা না করে বিয়ের অনুমতি দেয় তবে স্ত্রী সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

হিন্দু বিবাহ :

দু:খজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের হিন্দু পারিবারিক আইন এখন সেই আদিযুগে পড়ে আছে। যদিও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সনাতন হিন্দু আইন বাতিল করে আধুনিক হিন্দু পারিবারিক আইন প্রচলন করেছেন। যেমন ভারতে ছেলে মেয়েরা সমান অংশ সম্পত্তি পায়। বিবাহের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামুলক। স্ত্রী চাইলে যে কোন সময় তার স্বামীকে তালাক দিতে পারে। কিন্ত বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে হিন্দু স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের তালাক দিতে পারে না। বাবার সম্পত্তির পুরো অংশ সংসারের ছেলেরা লাভ করে। ময়েদের কোনো স্থায়ী উত্তরাধীকারের সম্পত্তি নেই।

হিন্দু বিবাহ কি :
হিন্দু বিবাহ একটি “স্যাকরামেন্ট” যার বাংলা অর্থ অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মার বন্ধন। সনাতন হিন্দু আইন অনুযায়ী হিন্দু বিয়েতে কোনো তালাক নেই। এই বিয়ে একবার হলে পরজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকে। বৈধ হিন্দু বিবাহের শর্তসমূহ।

পাটিপত্র :
পাটিপত্র বাঙালি হিন্দু বিবাহের প্রথম আচার। এই আচার লগ্নপত্র বা মঙ্গলাচরণ নামেও পরিচিত। ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ করে বিবাহ স্থির হলে নগদ বা গহনাপত্রে যৌতুক ও অন্যান্য দেনাপাওনা চূড়ান্তভাবে স্থির করার জন্য যে অনুষ্ঠান হয়, তাকেই পাটিপত্র বলে। এই আচারের মাধ্যমেই বিবাহের অন্যান্য আচারের সূচনা ঘটে।

পানখিল :
পানখিল বাঙালি হিন্দু বিবাহের দ্বিতীয় আচার। এটি পাটিপত্রের ঠিক পরেই পালিত হয়। পানখিলের অর্থ পান পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খিল দেওয়া বা খড়কে বেঁধানো। এই আচারটি প্রথমে বরের বাড়িতে এবং পরে কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পানখিল আচারে বাড়ির মেয়েরা এবং প্রতিবেশিনীরা বিয়ের গান গেয়ে থাকে। এই গানের বিষয়বস্তু হল রাম ও সীতার বিবাহ।

দধি মঙ্গল :
দধি মঙ্গল বিবাহের দিন বর ও কন্যার উপবাস। তবে উপবাস নির্জলা নয়। জল মিষ্টি খাওয়ার বিধান আছে। তাই সারাদিনের জন্য সূর্য্যোদয়ের আগে বর ও কন্যাকে চিড়ে ও দৈ খাওয়ানো হয়।

গায়ে হলুদ :
গায়ে হলুদ সংস্কৃত ভাষায় এই রীতিকে বলা হয় গাত্রহরিদ্রা। হিন্দু ধর্মে কয়েকটি জিনিসকে শুভ বলা হয়। যেমন শঙ্খধ্বনি, হলুদ ইত্যাদি। প্রথমে বরকে ও নিতবরকে সারা গায়ে হলুদ মাখানো হয়। পরে সেই হলুদ কন্যার বাড়ি পাঠানো হয় এবং কন্যাকে সেই হলুদ মাখানো হয়।

শঙ্খ কঙ্কন এবং বর বরণ :
শঙ্খ কঙ্কন কন্যাকে শাঁখা পরানো হয়। এরপর বিকালে বিবাহের মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়।

বর বিবাহ করতে এলে তাকে স্বাগত জানান কন্যাপক্ষ। সাধাবনত: কন্যার মা তার জামাতাকে একটি থালায় প্রদীপ, ধান দুর্ব্ব ও অন্যান্য কিছু বরণ সামগ্রী নিয়ে বরণ করেন। এরপর বরকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয় ও দুধ এবং মিষ্টি খাওয়ানো হয়।

সাত পাক বা সপ্তপদী :
সাত পাক বিবাহের মণ্ন্ডপে প্রথমে বরকে আনা হয়। এরপর কন্যাকে পিঁড়িতে বসিয়ে আনা হয়। সাধারণত: কন্যার জামাইবাবুরা পিঁড়ি ধরে থাকেন। কন্যা পান পাতা দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন। কন্যাকে পিঁড়িতে করে বরের চারপাশে সাতপাক ঘোরানো হয়।

বিভাহোমা :
বর ও কন্যার আগুনের সামনে প্রার্থনাকে বিভাহোমা বলে।

শুভদৃষ্টি :
শুভদৃষ্টি বিবাহের মন্ডপে জনসমক্ষে বর ও কন্যা একে অপরের দিকে চেয়ে দেখন।

মালা বদল: মালা বদল কন্যা ও বর মালাবদল করেন। এই রীতির অর্থ হচ্ছে দুজন একে অন্যকে জীবনসঙ্গী হিসাবে মেনে নিলেন। মুসলমান মতে একই ভাবে কন্যাকে বলতে হয় "কবুল"।

সম্প্রদান :
সম্প্রদান কন্যার পিতা কন্যাকে জামাতার হাতে সম্প্রদান করেন বেদমন্ত্রে। বরও জানান যে তিনি কন্যার ভরণ-পোষনের দায়িত্ব নিলেন। বিবাহের মন্ত্র হলো" যদেতৎ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।"

অঞ্জলি:
অঞ্জলি কন্যা ও বর খৈ অগ্নাহুতি দেন। প্রচলিত বাংলায় একে বলে খৈ পোড়া। বৈদিক যুগে মানুষ নানা ধরনের শক্তির উপাসনা করতেন। অগ্নিও তাদের মধ্যে অন্যতম। এরপর সিঁদুর দান। বিবাহের শেষ রীতি হল বর কন্যার কপালে সিঁদুর লেপন করেন। বাঙালি হিন্দু নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় সিঁদুর পরেন।

হিসেব করলে হিন্দু বিবাহের নিয়মের কোনো শেষ নেই। এতগুলো শর্ত স্বাভাবিকভাবে পালন করা সব সময় সবক্ষেত্রে হয়ত সম্ভবও হয় না। তাই ঝামেলা এড়াতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ১৯৯৮ সালে এক রায়ের মাধ্যমে হিন্দু বিবাহের প্রধান দুইটি শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। আর তা হলো- সপ্তপদী ও বিভাহোমা। এই দুইটি শর্ত পালন হলেই ধরে নেয়া হবে হিন্দু বিবাহ বৈধ।

হিন্দু বিবাহে ছেলে মেয়েদের বয়স :
হিন্দু সনাতন আইনে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের কোনো বয়স নির্ধারণ করা হয় নাই। যে কোনো বয়সের ছেলে মেয়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-১৯২৯ অনুযায়ী মেয়েদের ১৮ আর পুরুষদের ২১ বছর আগে বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে বিয়ে একবার সম্পন্ন হয়ে গেলে বিয়ে বৈধ হয়ে যাবে। কেবল যে বিয়ে সম্পাদন করেছে বা ছেলে মেয়ের অভিভাবকদের শাস্তি পেতে হবে।

হিন্দু বিবাহের নিবন্ধন :
২০১২ সালে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন নামে সরকার একটি আইন পাশ করে। যেখানে হিন্দু বিবাহের নিবন্ধন করার ব্যবস্থা্ ও পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তবে উদ্বেগজনক ব্যাপার হল- এই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয় নি। যার কারণে কেউ যদি বিবাহ করে নিবন্ধন না করে তবে তার কোনো মাস্তি হবে না এমনকি বিবাহ বৈধও হবে না।

সমাজ পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের আইন কানুনও বদলে যায়। সময়ের চাহিদা মোতাবেক তৈরি হয় যুগোপযোগী আইন। বাংলাদেশে মুসলিম ও হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কিছু পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে। যা কেবল সময়ের দাবি।

ঢাকা, শনিবার, জুলাই ২৯, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ২২৫৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন