সর্বশেষ
সোমবার ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৯ নভেম্বর ২০১৮

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার চালান রেস্তরাঁ

শনিবার, অক্টোবর ৭, ২০১৭

1129632322_1507322066.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
আশরাফুজ্জামান। স্বপ্ন ছিল মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবেন। হয়েছিলেনও তাই। কিন্তু বেশিদিন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করতে পারেননি। চাকরি হারিয়ে তিনি বেকার হয়ে পড়েন। এরপর অনেক পথ পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের কোনো পথ তিনি পাননি।

দেশের বাইরে আমেরিকায় গিয়েও তিনি তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। বেকার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ আমেরিকায় চাকরি নেন একটি ফাস্টফুড দোকানের ডেলিভারি ম্যান হিসেবে। জীবনে অনেক চড়াই- উৎরাই পেরিয়ে তিনি এখন আরেক স্বপ্ন সারথী নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। নামের পাশে আর মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বসাতে চান না তিনি।

তাইতো আধুনিক ফাস্টফুড ব্যবসা নিয়ে হাজির হয়েছেন। যেখানে তিনিই প্রধান বাবুর্চি। তিনিই মালিক। এভাবে পথ চলা শুরু তার। এভাবে চলতে চলতে আশরাফ এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। একটি ফাস্টফুড দোকান থেকে করেছেন তিনটি। নাম দিয়েছেন ক্যাফে মেট্রো। লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে তিনি আজ কোটিপতি। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দুঃখের কাহিনী।

শুধু আশরাফই নন। এমন শত শত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এখন বেকার জীবন-যাপন করছেন। কেউ বিদেশ বিভূঁইয়ে স্ত্রী সন্তান নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন। কেউবা দেশেই ভিন্ন কোনো চাকরি খুঁজছেন। কেউবা অন্য কোনো পেশা বেছে নিচ্ছেন। কেন এমন হচ্ছে?  

সূত্র মতে, সমুদ্রবিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে জাহাজের সংখ্যা। বিশ্বের ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। দেশে বছরে যে হারে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হচ্ছেন সে হারে চাকরির জায়গা নেই। নতুন জাহাজও সে হারে নামছে না। এছাড়া পৃথিবীতে এখন জাহাজ শিল্পে ধস নেমেছে। ফলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়েও অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না। আবার অনেক জাহাজ শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়ছেন অনেক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, নাবিক।

এমনই একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুজ্জামান। জীবনের করুণ কাহিনী বুকে লালন করে এখন পথ চলছেন। কি সেই কাহিনী? আশরাফের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় আশরাফ। আর বড় হওয়ায় সবার আশাও তাকে নিয়ে। রাজধানীতে মামার বাসায় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন আশরাফ। এরপর আশরাফ সিঙ্গাপুর থেকে এ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। সে সময় তিনি সিঙ্গাপুরে প্রথম হন। পড়াশুনা শেষ করে আশরাফ শিক্ষানবিশ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে একটি লাইটার শিপে যোগ দেন।

কিন্তু ১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে  কোম্পানির মাদার ভেসেল ডুবে যায়। চাকরি হারান আশরাফ। কোনো উপায়ান্তর না দেখে আশরাফ সিঙ্গাপুর ক্যাপেল শিপইয়ার্ডে যোগ দেন। পরে তিনি ইন্টিগ্রেটেড টেকনিক নামের একটি কোম্পানির প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। জাহাজে চাকরি করার সুবাদে আশরাফ পৃথিবীর নানা দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি ২০০১ সালে চাকরির উদ্দেশে আমেরিকা পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে তিনি শিপইয়ার্ডে চাকরি পাননি।

অনেক চেষ্টার পর আমেরিকায় তিনি ‘গাই অ্যান্ড গেলার্ড’ নামের একটি চেইন ফাস্টফুড দোকানে চাকরি নেন ডেলিভারি ম্যান হিসেবে। সেখানে তিন-চার মাস কাজ করার পর ‘এইচঅ্যান্ডএইচ বেগেল্‌স’ নামের আরেকটি ফাস্টফুড শপে কাজ নেন।  সেখানেই তিনি স্যামন ফিস, স্যাবল ফিস, স্টার্জন ফিস, স্যান্ডউইচ, পেস্ট্রি, টুনা ফিস, সালাদ, গ্রিক সালাদ, বিন সালাদ, ফ্রুট সালাদ এবং অন্যান্য খাবার বানানো শেখেন। কিন্তু যে বেতন পান তা দিয়ে নিজে চলা এবং বাড়িতে পাঠানো তার জন্য দুষ্কর হয়ে পড়ে।

এরই মধ্যে ২০০৯ সালে আশরাফের পিতার মৃত্যু হয়। বিষয়টি তার কাছে লুকিয়ে রাখা হয়। একদিন তার মা ফোনে ছেলে আশরাফকে বলেন, বাবারে তুই দেশে চলে আয়। আমি মরে গেলে তোরে দেখতে না পেলে কষ্ট পাবো। বড় কষ্ট পাবো। এ সময় আশরাফ তার বাবাকে ফোন দিতে বলে। কিন্তু বাবাকে ফোন না দিয়ে তাকে নানা ছলচাতুরি করতে থাকে। একাধিক দিন বাবাকে ফোনে চাইলে একই আচরণ করে পরিবার থেকে। আশরাফের আর বুঝতে বাকি রইলো না। তার বাবা পৃথিবীতে নেই। ওইদিনই তিনি আমেরিকা থেকে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত মতেই তিনি ২০০৯ সালের ২৩শে মে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে চলে আসেন। আর আমেরিকায় যাবেন না বলেও মনস্থির করেন। মাস খানেক যাওয়ার পরই সঙ্গে করে নিয়ে আসা অর্থকড়ি ফুরিয়ে যায়। চিন্তা করতে থাকেন কি করবেন। চাকরি কোথায় করবেন? কি চাকরি-ই বা করবেন?

সিদ্ধান্ত নিলেন নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়ে একটি থাই গ্লাসের দোকান দেবেন। এ হিসেবে সেখানে দোকানও দেন। কিন্তু ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। চিন্তায় পড়ে যান আশরাফ। সে সময় শিল্প এলাকা হিসেবে উত্থান হচ্ছিল সাভার এলাকা। একদিন তিনি সাভার যান। সেখানে থানা রোডে একটি দোকানও পেয়ে যান। কিন্তু পুঁজি কোথায়? পিতার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে দোকানের বায়না করেন। সাভারের থানা রোডে একটি থাই গ্লাসের দোকান দেন আশরাফ। এই তার ব্যবসা শুরু। সেটা ২০১০ সালের এপ্রিল মাস। ওই সময় দোকানের এক কোণায় ছোট্ট একটু জায়গা বের করেন। যেখানে মেহমান এলে বসান। কিন্তু তিনিতো অনেক কিছু রান্না করতে জানেন। বলতে গেলে পুরোদস্তুর বাবুর্চি। সেই চিন্তা থেকে থাই গ্লাসের ব্যবসার পাশপাশি  কফি বিক্রির ব্যবস্থা করেন।

তার নিজ হাতে তৈরি এগার পদের কফির নাম ছড়িয়ে পড়ে গোটা সাভারে। লোকজন আসতে থাকে। এখন থাই গ্লাসের ব্যবসা থেকে কফি বিক্রির ব্যবসা ভালো হচ্ছে। এ সময় আশরাফ যোগ করেন ফলের জ্যুস বিক্রি। আস্তে আস্তে থাই গ্লাসের ব্যবসা গুটিয়ে সেখানেই তৈরি ক্যাফে মেট্রো। আধুনিক সব খাবার তিনি নিজেই তৈরি করেন।

এরপর আশরাফ ফুড অ্যান্ড হসপিটালিটির উপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন রাজধানীর টমি মিয়া’স হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে। একই সঙ্গে শেখেন উত্তর ভারতীয় খাবার, কন্টিনেন্টাল খাবারসহ অন্যান্য খাবার রান্না করা শেখেন। এভাবে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ হয়ে ওঠেন আধুনিক পুরোদস্তুর বাবুর্চি। ব্যবসার পরিধি বেড়ে এখন সাভারে তার তিনটি রেস্তোরাঁ। একটি ব্যাংক কলোনিতে, অপর দু’টি থানা রোডে। প্রতিদিন শ’ শ’ মানুষ আসছেন ক্যাফে মেট্রোতে। বিশেষ করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত খেতে আসেন এখানে। কারণ আশরাফের রেস্তরাঁ খাবার স্বাস্থ্যসম্মত এবং মুখরোচক।

আশরাফের স্ত্রী শাহিনা আক্তার রেস্তরাঁ পরিচালনায় স্বামীকে সাহায্য করেন। তাদের একমাত্র কন্যা দিলরুবা জামান দিশারী এ-লেভেল সম্পন্ন করেছে।

আশরাফুজ্জামান বলেন, পিতার জমি বিক্রি করার ৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে আজ আমি কোটিপতি। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়েও স্বপ্নপূরণ করতে না পারার দুঃখ আমার থেকে যাবে সারাজীবন। কিন্তু বর্তমান জীবনটাকেও আমি এনজয় করছি। আজ আমার ক্যাফেতে ৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। তারা সবাই আনন্দের সঙ্গে কাজ করছেন। মানুষকেও আমি নিত্য-নতুন আইটেম দেয়ার চেষ্টা করি। প্রথম প্রথম নিজে রান্নার দায়িত্বে থাকলেও এখন প্রধান বাবুর্চি রয়েছেন। আমি তাদের সব কিছু দেখাশোনা করি।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার প্রসঙ্গে আশরাফুজ্জামান বলেন, দেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে চার শতাধিক ইঞ্জিনিয়ার বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের কর্মসংস্থান নেই। বছরে দেশে নতুন দু’টি জাহাজও নামে না। বেসরকারিভাবে যারা জাহাজ পরিচালনা করেন তারাও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় পিছিয়ে আসছেন।

এছাড়া একটি জাহাজে সর্বোচ্চ ৪/৫ জন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বিশ্বে সে পরিমাণ জাহাজ বাজারে আসছে না। ফলে কর্মসংস্থান কমে এসেছে। তিনি বলেন, আমার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এক বন্ধু এখন সিঙ্গাপুরে চাকরি হারিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। একবছর আগে তিনি চাকরি হারালেও নতুন কোনো চাকরি পাননি। এমন অনেক বেকার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন দেশে দেশে।

সূত্রমতে, সাগরে জাহাজ পরিচালনাকারী রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজের সংখ্যা না বাড়ায় কর্মসংস্থানের জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন নাবিক, অফিসার ও নৌপথে পণ্য পরিবহনে যুক্ত ব্যবসায়ীরা।

সমুদ্রগামী জাহাজ নিবন্ধনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামস্থ নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর (এমএমডি) সূত্রে জানা যায়, প্রাইভেট সাতটি প্রতিষ্ঠান এখন আর কোনো জাহাজ পরিচালনা করছে না। তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। অথচ এক সময় তাদের জাহাজ সমুদ্রে দাবড়ে বেড়াত। ফলে এসব কোম্পানির বহু নাবিক এখন বেকার।

সমুদ্রগামী জাহাজ ব্যবসা সম্পর্কে অভিজ্ঞ সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, শিপিং করপোরেশনের জাহাজ বৃদ্ধির সঙ্গে নাবিক ও অফিসারদের চাকরির বিষয়টি সরাসরি জড়িত। অথচ তাদের জাহাজ স্বল্পতায় নাবিক ও অফিসার তৈরিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে বেকার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, নাবিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সূত্র: মানবজমিন

ঢাকা, শনিবার, অক্টোবর ৭, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ৪৬৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন