সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৫ নভেম্বর ২০১৮

কুখ্যাত জলদস্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ডের অজানা কাহিনী

বুধবার, নভেম্বর ৮, ২০১৭

1123760569_1510135471.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
ব্ল্যাক বিয়ার্ডের জাহাজটির নাম ছিলো ‘কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জ’। বৃহদাকার সেই জাহাজে প্রায় ৩০০ জনের মতো দস্যু একত্রে থাকতে পারতো। ব্ল্যাকবিয়ার্ডের দলের দস্যুরা ছিলো কঠোর পরিশ্রমী এবং একইসাথে ভীষণ মাত্রার পানাসক্ত। মাঝে মাঝে তাদের উদ্যাম আচরণ এতটাই লাগামছাড়া হয়ে উঠতো যে তা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হতো ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে।

এই সমস্যা সমাধান তিনি শেষ পর্যন্ত করতে পারলেও যে অদ্ভুত পন্থায় তিনি এটি করেছিলেন তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়। কথিত আছে, একবার ব্ল্যাকবিয়ার্ড তার ফার্স্ট মেট ইসরায়েল হ্যান্ডসের সাথে বসে মদ্যপান করছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করে সামনে থাকা মোমবাতিটি নিভিয়ে দিয়ে বন্দুক বের করে হ্যান্ডসের হাঁটুতে গুলি করে বসেন তিনি।

ল্যাকবিয়ার্ডের এমন কাজে যারপরনাই অবাক হ্যান্ডস আহতাবস্থায় গোঙাতে গোঙাতে জানতে চাইলেন, কোনো দোষ না করা সত্ত্বেও কেন তার সাথে এমনটা করা হলো। জবাবে ব্ল্যাকবিয়ার্ড নির্লিপ্ত স্বরে জানিয়েছিলেন, “যদি আমি যখন-তখন ক্রু মেম্বারকে গুলি না করি, তাহলে তারা ভুলে যাবে যে আমি কে!”

মাঝে মাঝে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের মাতলামি এতটাই মাত্রাছাড়া হয়ে যেত যে তার উদ্ভট কর্মকান্ডকে কোনো সংজ্ঞার আওতায় ফেলা সম্ভব হতো না। একবার মাতালাবস্থায় তার শখ হলো জাহাজে কে সবচেয়ে বেশি কষ্ট সহ্য করতে পারে সেই পরীক্ষা করবেন তিনি। যেমন চিন্তা, তেমন কাজ।

তিনি আহ্বান জানালেন কারা সেই চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে চায়। তার আহবানে সাড়া দিয়ে অনেকেই এগিয়ে এলো। তাদের সবাইকে নিয়ে জাহাজের গুদামঘরে গেলেন তিনি। এরপর সেখানকার প্রতিটি ফাঁকা বন্ধ করার ব্যবস্থা করলেন। এবার একটি পাত্রভর্তি সালফার নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড। অল্প সময়ের মাঝেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো পুরো রুম। কাশতে কাশতে ভেতরে আটকে পড়া জলদস্যুদের অবস্থা খারাপ হবার দশা। জীবন বাঁচাতে তারা দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলো।

তাদের চিৎকার-চেচামেচি শুনে ছুটে এসেছিলো জাহাজের অন্যান্য নাবিকেরাও। তারা দরজা ভেঙে তাদেরকে উদ্ধার করে, তবে বেরোন নি শুধু ব্ল্যাকবিয়ার্ড। সবাই বের হয়ে গেছে এটা নিশ্চিত হবার পরই হেলেদুলে গুদামঘর থেকে বেরোলেন তিনি। এরপর তিনি বললেন, পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে কে কতক্ষণ দমবন্ধ না হয়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকতে পারে! এবার অবশ্য আর কোনো ভলান্টিয়ারই পাওয়া যায়নি।

নারীমহলে বেশ ভালোই জনপ্রিয় ছিলেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড, অন্তত তার বিয়ের সংখ্যা সেই ব্যাপারেই সাক্ষ্য দেবে। জীবদ্দশায় মোট ১৪টি বিয়ে করেছিলেন তিনি। অবশ্য বিবাহ পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রীদের যেসব অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো তা থেকেই তার বিবাহ-বহুলতার কারণ সম্বন্ধে আন্দাজ করা যায়।

যদি কোনো নারীকে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের ভালো লেগে যেত আর তাকে তিনি বিয়ে করতে চাইতেন, তাহলে তার সাথে তিনি এমনভাবে আচরণ করতেন যেন সেই নারীই তার জীবনের প্রথম ভালোবাসা! এরপর তিনি তাকে বিয়ের জন্য জোর দিতেন। অবশ্য ব্ল্যাকবিয়ার্ড তো আর প্রথাগতভাবে চার্চে বিয়ে করতে পারতেন না, তাই তার দলের সদস্যদের কেউ পাদ্রীর অভিনয় করে জাহাজেই বিয়ে সেরে দিতো।

বিয়ের পরমূহুর্তটা সেই নারীর কাছে স্বপ্নময় ঠেকলেও অল্প সময়ের মাঝেই শুরু হতো দুঃস্বপ্নের। প্রথম রাতটা একসাথে কাটানোর পরই ব্ল্যাকবিয়ার্ড ডেকে আনাতেন তার দলের কয়েকজন সদস্যদকে। এরপর তার চোখের সামনেই নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে তাদের সাথে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতেন তিনি।

ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজ থেকে প্রাপ্ত মালামাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে এক অদ্ভুত জিনিসের সন্ধান পেয়েছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদগণ, যা তাদেরকে বিস্মিত না করে পারে নি। কুখ্যাত এই দস্যুর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মাঝে পাওয়া গিয়েছিলো একটি সিফিলিস সিরিঞ্জও! এর ভেতরে পারদ ভরে তিনি নিজের সিফিলিসের চিকিৎসার জন্য সবসময় সাথে রাখতেন।

এই জিনিসটি খুঁজে পাওয়ার ঘটনা অদ্ভুত ঠেকলেও এ থেকে তার জীবনের বেশ কিছু কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। ব্ল্যাকবিয়ার্ডের অভিযানগুলোতে প্রাধান্য পেত নানা ধরনের ওষুধ। কোনো জাহাজ আক্রমণ করে যদি ডাক্তারের সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে তাকে নিজের সাথে রেখে দিতেন তিনি। একবার সাউথ ক্যারোলাইনায় এক জাহাজ আক্রমণ করে সবাইকে জিম্মি করে তার দল। এরপর তিনি তাদের কাছে কেবল ওষুধ ভর্তি সিন্দুকই চেয়েছিলেন।

কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জে কামানের সংখ্যা ছিলো মোট ৩১। তবে এসব কামানে গোলার পরিবর্তে ‘অন্যকিছু’ ব্যবহার করতেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড। আসলে তিনি যখন সদলবলে কোনো জাহাজে হামলা চালাতেন, তখন সেই জাহাজ ডুবিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তাতে লুটপাট চালানোই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। তাই তিনি এমন কিছু জিনিসই ‘অন্যকিছু’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যেগুলোর ভয়াবহতা গোলার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

কুখ্যাত এই জলদস্যুর জাহাজে ব্যাগভর্তি কাচের টুকরা, পেরেক থাকতো। কোনো জাহাজ লক্ষ্য করে যখন এসব নিক্ষেপ করা হতো, তখন জাহাজটির অবকাঠামোগত ক্ষতির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিতো সেখানে অবস্থানরত মানুষগুলোর শারীরিক দুর্দশা। যখন ব্ল্যাকবিয়ার্ড তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঐ জাহাজে যেতেন, ততক্ষণে অনেকেরই দফারফা হয়ে যেত। অবশ্য সবসময় যে তিনি কেবল এসব নিক্ষেপ করতেন তা কিন্তু নয়। যখন মেজাজ অতিরিক্ত মাত্রায় চড়ে যেত, তখন একসাথে দুটোই নিক্ষেপ করা হতো কুইন অ্যান’স রিভেঞ্জ থেকে। ফলে তখন ‘রিভেঞ্জ’ যে কতটুকু ‘ব্লাডি’ হয়ে উঠতো তা বোধহয় না বললেও চলে!

ব্ল্যাকবিয়ার্ড এত দস্যুতা করে ঘুরে বেড়াবে, আর তৎকালীন অন্যতম শক্তিশালী ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছুই করা হয় নি, এমনটা মোটেও ভাবা যাবে না। আসলে জলদস্যুদের স্বর্ণযুগে তারা এতটাই দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছিল যে অনেক সময় সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়েছিলো ব্ল্যাকবিয়ার্ডের মতো দস্যুদের পেছনে ছোটা বাদ দিতে।

তৎকালে এমন এক নিয়ম ছিলো যে, কোনো জলদস্যু যদি আত্মসমর্পণ করে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন দস্যুতায় না জড়ানোর ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে তাকে পুরোপুরিভাবে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এ কথা সত্য যে, ব্ল্যাকবিয়ার্ডও সেই ক্ষমাপ্রাপ্তদের দলে একবার নাম লিখিয়েছিলেন। তবে এর আগে তিনি সর্বোচ্চ পরিমাণ সম্পদপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে নিয়েছিলেন।

প্রথমেই ব্ল্যাকবিয়ার্ড তার বন্ধু স্টিড বনেটকে রাজি করান যেন বনেট আত্মসমর্পণ করে সেই ক্ষমাপ্রাপ্তদের দলে যোগ দেন। এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনায় বনেট যখন মশগুল, তখন ব্ল্যাকবিয়ার্ডের লোকেরা বনেটের জাহাজে হামলা চালায়। তাকে এবং জাহাজের অন্য সবাইকে চোখ বেঁধে এক নির্জন দ্বীপে ফেলে আসে তারা, কেড়ে নেয় বনেটের সকল সম্পদ। বনেট যখন ফিরে আসলেন, ততক্ষণে তার সবকিছুই চলে গেছে ব্ল্যাকবিয়ার্ড বাহিনীর করতলে। ফলে পুনরায় দস্যুতার খাতায় নাম লেখানো ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।

কাঙ্ক্ষিত ক্ষমা পেয়ে গেলেও খুব বেশিদিন এভাবে হাত-পা গুটিয়ে থাকতে ভালো লাগে নি এই জলদস্যুর। তাই কিছুদিন পরে আবারও তাকে দেখা গেল বাহিনী নিয়ে সাগরের বুকে ত্রাস সঞ্চার করে বেড়াতে, ক্রীতদাসবাহী জাহাজ ও অন্যান্য সম্পদশালী জাহাজগুলোতে লুটপাট করে বেড়াতে।

এবার আর সহ্য করলো না সামরিক বাহিনী। লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেনার্ড দুটো জাহাজ আর ৬০ জন সেনা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে নিধনের অভিপ্রায়ে। তিনি তার লোকদের এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যেন দূর থেকে দেখে তার জাহাজটিকে পরিত্যক্ত মনে করে ব্ল্যাকবিয়ার্ড তাতে আসতে আগ্রহী হয়।

সত্যি সত্যিই সমুদ্রের ত্রাস ব্ল্যাকবিয়ার্ড সেদিন মেনার্ডের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। অরক্ষিত অবস্থায় যখন তিনি জাহাজের বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, তখনই হঠাৎ করে দস্যুবাহিনীর উপর চড়াও হয় মেনার্ডের সেনারা। এমন আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যায় জলদস্যুরা। ক্ষেপে গিয়ে ব্ল্যাকবিয়ার্ড সরাসরি আক্রমণ করে বসেন মেনার্ডের উপর। মেনার্ডও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। তিনি গুলি করে বসেন সরাসরি ব্ল্যাকবিয়ার্ডের বুকেই।

এতে যেন হিতে বিপরীত হয়ে গেলো। আঘাতের কারণে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে মেনার্ডের উপর তীব্রভাবে হামলে পড়লেন ব্ল্যাকবিয়ার্ড। তার আঘাতের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিলো যে তাতে মেনার্ডের তলোয়ার ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিল। হয়তো মেনার্ড মারাই পড়তেন, যদি না তার বাহিনীর কেউ ঠিক সেসময় পেছন থেকে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের গলায় ছুরি চালিয়ে না দিত। এভাবে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তার দেহ মোট ৫টি বুলেট এবং ২০ বারেরও বেশি ছুরিকাঘাত সহ্য করেছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মৃত্যু হয় তার। মরার আগমুহূর্তেও তিনি বন্দুকে পুনরায় গুলি ভরছিলেন যেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিপক্ষের ক্ষতি করে যেতে পারেন।

ঢাকা, বুধবার, নভেম্বর ৮, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস এ এই লেখাটি ৩৭৪ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন