সর্বশেষ
রবিবার ৮ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভাষা সৈনিক জয়নাল আবেদীন আর নেই

রবিবার, নভেম্বর ১২, ২০১৭

1967021815_1510499631.jpg
সাভার প্রতিনিধি :
ভাষা সৈনিক, বীরমুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাল আবেদীন খান আর নেই। আজ রোববার( ১২ নভেম্বর ২০১৭) সকালে সাভারের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। গতরাত ১২ টায় শ্বাসকষ্ট নিয়ে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে রোববার ভোরে তিনি মারা যান। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।

তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে তার আত্মীয়-স্বজনরা ছুটে আসেন। এদিকে, বিকেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাভার উপজেলা চত্বরে তার জানাযার আয়োজন করা হয়। পরে সাভার পৌর এলাকার তালবাগ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সংগ্রামী জয়নাল আবেদীন খান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৮’র ১১ দফা, ৬৯’র গণআন্দোলন, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক প্রতি হিংসায় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জেল খেটেছেন বহুবার। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ট্রাস্টিবোর্ডের উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক সদস্য ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাভারের সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন।

জয়নাল আবেদীন খান ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পাবনা মহকুমার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ) শাহজাদপুর থানার বড়াল নদীর তীরে চয়ড়া গ্রামে মামা বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার বাবার বাড়ি পাবনার সাথিয়ায় তিনি সেখানেই বড় হয়েছেন। বাবা তালেব আলী খান ও মাতা উম্মে কুলসুম হাফিজা খাতুনের প্রথম সন্তান তিনি। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে পাবনার গোপালচন্দ্র ইনিস্টিটিউট থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার উদ্যোগে সে বছর অক্টোবর মাসে ছাত্র ইউনিয়ন পাবনা জেলা শাখা গঠন করা হয়। রাজনৈতিক কৌশলের কারণে তিনি এ কমিটির সদস্য হিসেবে থাকেন এবং পাবনা জেলা যুবলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন। একই সময়ে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সদস্য হন।  

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে অংশ নেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল মান্নান তালুকদারের নেতৃত্বে মিছিলে অংশ নেয়ার কারণে গ্রেফতার করা হয় জয়নাল আবেদীন খানকে। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম লীগের একটি সভা পণ্ড করে দেয়ার জন্য কামাল লোহানী, রনেশ মৈত্র, আব্দুল মতিনসহ তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ৬ মাস পাবনা ও রাজশাহী কারাগারে আটক থাকেন। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্ট পাবনা উত্তর-পূর্ব কর্মী শিবিরের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বি.এ পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে ভর্তি হন এবং পর্যায়ক্রমে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।

ঢাকা আসার পর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে নানা কার্যক্রম শুরু করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হলে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে যুবলীগ, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে পুনরায় গ্রেফতার হন। কিছুদিন পর রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। পার্টির নির্দেশে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে পাবনায় আইন পেশা শুরু করেন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মহকুমা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাবনায় কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে আবার ঢাকায় ফিরে এসে আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে (মেম্বার অফ দ্যা প্রভিন্সিয়াল এসেম্বলি-এমপিএ) ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ব্যানারে পাবনার বেড়া-সাথিয়া এলাকা থেকে নির্বাচন করেন।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতের আগরতলায় পাড়ি জমান। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের মোটিভেশন ক্যাম্প স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় গভীর পাহাড়ের ভিতর কল্যাণপুর নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প (সুইমিং) প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি এর ‘ইনচার্জ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হলে নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং এক জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদের নির্দেশে সার্কেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন এবং ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি চাকরী থেকে অবসর নেন। স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন সাভারে গেন্ডায়। অনেকটা চুপিসারে মানুষের মঙ্গল কামনায় কাটছিল তার দিন। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অনুপ্রেরণায় সাভারে গঠিত হয় দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক সংগঠন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সাভার। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে সারা দেশের সনাকের ভোটে তিনি টিআইবি’র ট্রাস্টিবোর্ডের উপদেষ্টা পরিষদে সনাক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত তিনি সনাক সাভারের সদস্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।

ঢাকা, রবিবার, নভেম্বর ১২, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস এইচ এই লেখাটি ২৮১ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন