সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৫ নভেম্বর ২০১৮

মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসের নেতৃত্বে কর কর্মকর্তা

বুধবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১৭

1385424877-1749_5.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের প্রধান সরকারের একজন সহকারী কর কমিশনার। অর্থের বিনিময়ে সহযোগীদের নিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করেন তিনি। কয়েক বছর ধরে প্রশ্ন ফাঁস করে এই চক্রটি কয়েক কোটি টাকা আয় করেছে।

এই সহকারী কর কমিশনারের নাম দিপঙ্কর চন্দ্র সরকার। সরকারি চাকরির আড়ালেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের চক্রটি গড়ে তুলেছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তার অফিস থেকেই জব্দ করেছেন ১ কোটি ৭ লাখ টাকার চেক। আর তার সহযোগীদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে আরো ৩ কোটি ৫০ লাখ ২৫ হাজার টাকার চেক।

চক্রটি এ বছরই কমপক্ষে ৬০ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের কাছ থেকে ৪ কোটি ৫৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার চেক নেয়। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ওই সব চেকসহ ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও উদ্ধার করে। এ ব্যাপারে আদালতে ১৬৪ ধারায় একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পলাতক বেশি :
এ পর্যন্ত দিপঙ্করসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চক্রের প্রধান দিপঙ্কর গ্রেপ্তার হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসেন। অন্যরা ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে জামিনে মুক্ত হন।

মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের পাঁচজন আইনের আওতায় এসেছেন। গ্রেপ্তার হলেও তারা এখন জামিনে আছেন। তারা হলেন- সামছুর রশীদ ওরফে দিপু (চিকিৎসক), সোলায়মান হোসেন ওরফে মেহেদি (চিকিৎসক), একরামুল ইসলাম ওরফে বাবু (বেকার যুবক), রাশেদুজ্জামান ওরফে রিপন (ছাত্র) এবং সাবিনা ইয়াসমিন ওরফে তিন্নী (রিপনের আত্মীয়)।

মামলার এজাহারে নাম আসা ১৫ জনই পলাতক। তাঁ-রা হলেন সাবিনার ভাই কলেজশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন, সুজন ওরফে রাজা বাবু (পঞ্চগড়ের একটি কলেজের শিক্ষক), ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী সাইফুল আলম ওরফে বাদশা ও ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাসেল, চিকিৎসক আসাদ ও অনিক, মোহাম্মদ লিটন (শুভেচ্ছা কোচিং সেন্টারের একজন মালিক) এবং তানজির হাসান ওরফে প্রেমেল (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলের ছাত্র)। এছাড়া আবু তালেব, এস কে নূরুল ইসলাম, রোকোনুজ্জামান, সামিউল সোহান, রিয়াদ রহমান, পারভেজ হোসেন ও কামরুল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা পাওয়া যায়নি।

র‍্যাব-১০ এর কর্মকর্তা মুহম্মদ মহিউদ্দীন ফারুকি প্রথম আলোকে বলেন, যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে।

চেক ও প্রশ্ন উদ্ধার :
এ বছরের ৬ অক্টোবর সকাল ১০টায় ছিল ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা। ওই দিন সকাল আটটায় র‍্যাব-৩ রাজধানীর গ্রিন রোড এলাকার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে দিপঙ্করকে গ্রেপ্তার করে। র‍্যাব দিপঙ্করের মুঠোফোন জব্দ করে। পরীক্ষা করে র‍্যাব দেখে, মুঠোফোন থেকে দিপঙ্কর তার সহযোগী একরামুল ইসলামকে মেডিকেলের প্রশ্ন বিতরণ সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন।

মুঠোফোনের সূত্র ধরে র‍্যাব যাত্রাবাড়ী থেকে একরামুলকে গ্রেপ্তার করে। একরামুলের কম্পিউটারে মেডিকেলের প্রশ্নপত্র পায়। ওই দিন র‍্যাব দিপঙ্করকে নিয়ে সেগুনবাগিচার কর অঞ্চল-৬-এ যায়। রাজস্ব কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দিপঙ্করের অফিস থেকে ১ কোটি ৭ লাখ টাকার ১৪টি চেক, প্রশ্নপত্র, ১৬ জন পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রের ফটোকপি উদ্ধার করে।

পরদিন ভোরবেলা র‍্যাব-১০ রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকায় সাবিনা ইয়াসমিনের বাসায় যায় এবং ওই বাসা থেকে ৩৫টি চেক, প্রশ্নপত্র, শিক্ষার্থীদের ১১টি সনদ উদ্ধার করে। এরপর মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে সাবিনার আত্মীয় রাসেদুজ্জামানের বাসা থেকে প্রশ্নপত্র ও তিনটি চেক উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে আদাবরে একটি বিলাসবহুল ভবনে সামছুর রশীদের বাসায় যায়। র‍্যাব তার কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের তিনটি চেক, ১০ পরীক্ষার্থীর মূল সনদ, পাঁচজন অভিভাবকের মূল জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রশ্নপত্র উদ্ধার করে।

এর পরদিন, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর র‍্যাব গুলশানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক সোলায়মান হোসেনের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের পাঁচটি চেক, প্রশ্নপত্র, নয়জন শিক্ষার্থীর মূল সনদ এবং পাঁচজন অভিভাবকের মূল জাতীয় পরিচয়পত্র জব্দ করে। র‍্যাব তাদের প্রত্যেককেই গ্রেপ্তার করে। র‍্যাব বাদী হয়ে পাবলিক পরীক্ষা আইনে রাজধানীর কলাবাগান ও হাজারীবাগ থানায় যথাক্রমে ৭ ও ৮ অক্টোবর দুটি পৃথক মামলা করে।

তবে এ সম্পর্কে কিছু জানে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক এম এ রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, পরীক্ষার দিন কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল কি না বা প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছিল কি না, তা র‍্যাব তাদের জানায়নি।

মেডিকেলে ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁসে লেনদেন-
কর কর্মকর্তার কারবার :

‘দিপঙ্কর পারে না এমন কোনো কাজ নেই’—সহকারী কর কমিশনার দিপঙ্কর সম্পর্কে এমনই মন্তব্য তারই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা দিপঙ্কর ২০০৬ সালে কর পরিদর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর ১০ বছর পর ২০১৬ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পান।

মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা নেয়ার অভিযোগ আছে দিপঙ্করের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার অভিযানে অংশ নেয়া র‍্যাব-৩-এর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, চাকরি দেয়ার সূত্রেই দিপঙ্করের সঙ্গে যাত্রাবাড়ীর বেকার যুবক একরামুল ইসলামের সম্পর্ক তৈরি হয়। একরামুলকে দিয়ে দুটি ই–মেইল খোলান। তাকে দিয়ে প্রশ্ন সংগ্রহ ও প্রশ্ন বিতরণ করান। আদালতে দেয়া জব্দ তালিকায় সেই ই–মেইল ও ই–মেইলে আসা প্রশ্নপত্র আছে।

এ ব্যাপারে দিপঙ্কর বলেন, একজন ভালো কর আদায়কারী কর্মকর্তা হিসেবে তার সুনাম আছে। এ জন্য প্রতিবছর তাকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। পেশাগত কাজের কারণে সংক্ষুব্ধ পক্ষ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে ফাঁসিয়েছে। প্রশ্নপত্র ও চেক উদ্ধার সাজানো নাটক। ছাত্রজীবনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। পরে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য হয়েছিলেন।

কী অবস্থা তাদের :

মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১১ অক্টোবর দিপঙ্করকে সাময়িক বহিষ্কার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের তদন্তেও দিপঙ্করের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে র‍্যাব ধরে নিয়ে যাওয়ার পরপরই সোলায়মানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চিকিৎসক সামছুর রশীদও আর আগের জায়গায় কাজ করেন না। তার নতুন কর্মস্থলে গেলে সামছুর রশীদ দাবি করেন, কেউ কারসাজি করে তাকে এ ঘটনায় জড়িয়েছে। মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে রাসেদুজ্জামানের বাসায় গিয়ে জানা যায়, তিনি ও তার সহভাড়াটেরা বাসা ছেড়ে দিয়েছেন।

ব্যাংককে নির্দেশ :

পুলিশ, র‍্যাব ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগদ টাকা আদায়ের জন্য চক্রটি চেক, জাতীয় পরিচয়পত্র বা শিক্ষার্থীদের মূল সনদ রেখে দিত। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে নগদ টাকা দিয়ে সেসব ফেরত নেয়ার অলিখিত চুক্তি ছিল। জব্দ করা ৬০টি চেকের ১৪টি পাওয়া গেছে দিপঙ্করের অফিস থেকে। দিপঙ্করকে দেয়া চেকের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে।

চেকের সঙ্গে দেয়া মেডিকেল পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও মূল সনদ জমা দেয়া চারজন শিক্ষার্থী জানান, তাদের কেউ নিজ হাতে কাউকে চেক দেয়নি। তাদের বাবা, মামা বা পরিবারের অন্য সদস্য এটা করেছিলেন। তাদের একজন মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন।

গত ৫ নভেম্বর কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক আলহাজ উদ্দীন দিপঙ্করের কাছ থেকে পাওয়া চেকগুলোর মালিকদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা যেন ব্যাংকগুলো দেয়, তার জন্য আদালতে আবেদন করেন। এরপর ১৩ নভেম্বর আদালত ব্যাংক ব্যবস্থাপকদের তথ্য দিতে নির্দেশ দেন। অপর মামলায় জব্দ হওয়া ৪৬টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে আদালতের কাছে আবেদন করবে র‍্যাব-১০।

পুরো বিষয়টি শোনার পর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, 'অর্থ নিয়ন্ত্রণ করছে সবকিছু। এক শ্রেণির অভিভাবকের বিশ্বাস, অর্থ ঢাললে প্রশ্নপত্র পাওয়া যাবে। আবার প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই সৎ, এটা ভাবা ঠিক হবে না। মেডিকেল শিক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন না করলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতেই থাকবে। আর মানুষ বঞ্চিত হবে মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা থেকে।'
সূত্র : প্রথম আলো


ঢাকা, বুধবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ৬৬৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন