সর্বশেষ
রবিবার ৮ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ব্যাংকিং খাতে সংকট: 'নামে-বেনামে ইচ্ছামতো ঋণ'

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৮

5_0.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বড় ধরণের সংকট কাল পার করছে৷ পাহাড়সম খোলাপি ঋণ এবং নগদ টাকার সংকটে ব্যাংকগুলো সমস্যায় আছে৷ একটি নতুন ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পথে, সংকটে আছে আরো কয়েকটি ব্যাংক৷

ব্যাংকের ওপর আস্থাহীনতা আর সুদের হার কম হওয়ায় ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলে নিচ্ছে৷ রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ায় নতুন ব্যাংকগুলোও সফল হচ্ছে না, যার বড় উদাহরণ ফার্মার্স ব্যাংক৷ ব্যাংকটি এখন দেউলিয়া প্রায়৷ গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পরছে না তারা৷

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই বেশি৷ সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর, জানা গেছে জনতা ব্যাংকের এক গ্রাহককে সর্বোচ্চ ঋণ দেয়ার কেলেঙ্কারির কথা৷ দৈনিক প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী সেই গ্রাহক হল এননটেক্স গ্রুপ৷ ছয় বছরে এই গ্রাহককে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা দেয়া হয়েছে৷ আইন অনুযায়ী মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে৷ জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা৷ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না৷

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে এখন পুঞ্জিভূত খেলাপী ঋণের পরিমান প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা৷ গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা৷ খেলাপি ঋণের ৩৪ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের৷ এছাড়া ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা৷ বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৩২১ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পাঁচ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা৷

ঋণ অবলোপন

অবলোপন করা ৪৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ যোগ করলে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা৷ ঋণ অবলোপন হল পাঁচ বছরের পুরনো খেলাপি ঋণ, যা আদায় হচ্ছে না; তার বিপরীতে একটি মামলা ও শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিত বা প্রভিশন রেখে মূল খাতা থেকে বাদ দেয়া৷

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখন নগদ টাকার সংকটে পড়েছে৷ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির শনিবার অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বলেন, 'একটি বেসরকারি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে৷ বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে ফেলছে৷ একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে৷ শেয়ারবাজারের আতঙ্ক ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়ছে৷ এ ব্যাপারে আমি মাননীয় অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি৷'

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ওই অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'আমদানি যে হারে বাড়ছে, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় সে হারে আসছে না৷'

ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে, দাম বেড়ে গেছে৷ প্রয়োজন মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় ১৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে৷ এর মাধ্যমে বাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে৷

দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে 'সরকারি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তিনটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তুলে সরকারি ব্যাংকে জমা করেছে৷ হঠাৎ করে বড় অঙ্কের টাকা তুলে ফেলায় কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে ব্যাংক তিনটি৷'

এই পরিস্থিতিতি ব্যাংকের আমানতের সুদের হার বাড়তে শুরু করেছে৷ গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ টাকা পেতেই বেসরকারি ব্যাংকগুলো আগের চেয়ে বেশি সুদ দিতে শুরু করছে৷ ব্যাংক আমানতের সুদহার ২ থেকে ৪ শতাংশ বেড়ে এখন দুই ডিজিটে পৌঁছেছে৷ তবে অর্থমন্ত্রী অগ্রণী ব্যাংকের অনুষ্ঠানেই দাবি করেছেন, 'ব্যাংকিং খাতে কোনো তারল্য সংকট নেই৷ কাজেই আগ্রাসী হয়ে চড়া সুদে আমানত না নেওয়ার জন্য আমি ব্যাংকারদের অনুরোধ করছি৷'

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের(সিপিডি) অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলম মোয়াজ্জেম ডয়চে ভেলেকে বলেন, 'ব্যাংকগুলো তার সামর্থ্যের বাইরে অনেক বেশি ঋণ দিয়েছে এবং তা ফেরত আসছে না৷ আবার পুঁজিবাজার যখন চাঙ্গা হয়েছিল তখন ব্যাংকের টাকা সেখানে গেছে৷ আর নতুন মুদ্রানীতিতে অ্যাডভান্স ডিপোসিট রেশিও প্রভাব ফেলেছে৷ একই সঙ্গে আমদানি বেড়েছে এবং টাকার তুলনায় ডলারের তেজি অবস্থা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে৷ ব্যাংক থেকে টাকা চলে গেছে৷ তবে এই তারল্য সংকট সাময়িক৷'

সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মীর্জা আজিজলু ইসলাম বলেন, 'ফার্মার্স ব্যাংক একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে৷ আরো কিছু ব্যাংক সমস্যায় আছে৷ তবে আমি মনে করি ব্যাংকের সার্বিক তারল্য ঠিক আছে৷ অতি তারল্য কমে গেছে৷ আর ব্যাংকগুলো এখন তাদের আমনত বাড়াতে সুদের হার বাড়াচ্ছে৷ এটা নিয়ে অযথা আতঙাক সৃষ্টি হচ্ছে৷'

ব্যাংকের এই সংকট চলে আসছে অনেক দিন ধরেই৷ গত ১৮ জানুয়ারি সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম জাতীয় সংসদে বলেন, '২০১৭ সালে ব্যাংক খাত নড়বড়ে অবস্থায় পড়েছে৷ ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে ২০ টিতে আর্থিক অবস্থা ছিল দৃশ্যমানভাবে খারাপ৷ অন্য ব্যাংকগুলোতেও কমবেশি সুশাসনের অভাব ছিল৷ খেলাপি ঋণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে৷ নামে-বেনামে ইচ্ছামতো ঋণ নেওয়া হয়েছে৷ ব্যাংকের পরিচালক, নির্বাহী, বড় কর্মকর্তারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন৷'

তিনি ঋণ খেলাপিদের নাম ঘোষণা করা, কুঋণ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করার দাবি জানিয়ে বলেন, 'লুটপাটের পরেও সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা মূলধনের যোগান দিতে হচ্ছে৷ যে টাকা জনগণের করের টাকা, সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো টাকা৷ নতুন ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি৷ তারপরও নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে৷'

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার খালেদ বলেন, '২০১০ সাল থেকেই আমরা ব্যাংকিং খাতে লুটপাট দেখতে পাই৷ বেসিক ব্যাংকের মত একটি ব্যাংক খালি হয়ে গেল অথচ চেয়ারম্যারন আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না৷ আসলে ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা লুটপাট হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবে৷ আর সেটা রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকে বেশি হয়েছে৷ এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখার দায়িত্ব হলেও ব্যাংকিং আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাত পা বেঁধে দেয়া হয়েছে৷ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ক্ষমতা নেই৷ সুতরাং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া ব্যাংক লুটপাট বন্ধ করা যাবে না৷'

নতুন আরেকটি আইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক প্রভাব বাড়ানো হয়েছে৷ এখন একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ চারজন সদস্য হতে পারবেন৷ এটা ব্যাংক খাতকে আরো ঝঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করেন খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ৷ তিনি বলেন, 'নতুন ব্যাংকগুলো অনুমোদনের ব্যাপারেও সক্ষমতা দেখা হয়নি৷ রাজনৈতিক বিবেচনা এবং পরিবারকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে৷ ফার্মার্স ব্যাংক তার উদাহরণ৷' সূত্র: ডয়েচে ভেলে


ঢাকা, সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // জে এইচ এই লেখাটি ৪৪৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন