সর্বশেষ
সোমবার ৯ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সন্তানের কাছে নিজেকে যেভাবে বিরক্তিকর করে তুলছেন

বুধবার, এপ্রিল ৪, ২০১৮

image-67378_3.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

সন্তান জন্মদানের পর তাকে আদর, শাসন, শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রতিটি মা-বাবারই অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু আপনার ইচ্ছাকৃত কিংব অনিচ্ছাকৃত করা কিছু কাজ, চিন্তা ও আচরণগত ভিন্নতা আপনাকে বিরক্তিকর অভিভাবকের উপাধি এনে দিতে পারে। ব্যর্থ অভিভাবক হওয়ার পেছনের কারণ আপনার নিত্যদিনের কাজকর্মের মধ্যেই রয়েছে।

আপনি যতই নিজেকে বোঝান যে আমি ভালো অভিভাবক, সন্তান লালন পালনে আমার কোনো ত্রুটি নেই, তারপরেও কিছু না কিছু কারণ থাকে যার কারণে দিন শেষে সন্তানের কাছে আপনি হয়ে উঠেন ‘বিরক্তিকর’। অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিরক্তিকর কিংবা ব্যর্থ অভিভাবকের কিছু লক্ষণ দেয়া হলো। সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের মাঝে চিড় ধরার আগেই কুলক্ষণের চক্রকে ভেঙে ফেললে মঙ্গল আপনারই।

# সন্তানের পরিবর্তে অন্যের সঙ্গে কথা বলা
মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের কথোপকথন সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে সন্তান যখন বড় হতে থাকে তখন বিভিন্ন বিষয়ে তার নিজস্ব মতামত তৈরি হতে থাকে। বয়ঃসন্ধিকাল ও কৈশোরে ছেলেমেয়েদের আচরণ নিয়ে গবেষণারত সাইকোলজিস্ট বারবারা গ্রীনবার্গের মতে, ‘সঠিক পদ্ধতিতে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ সব অভিভাবকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।অভিভাবক হিসেবে যারা ব্যর্থ হন তারা মূলত তাদের সন্তানদের কথা শোনেন না। সেই সঙ্গে তারা তাদের সন্তানের প্রতি রাগান্বিতভাবে বা একতরফা কথা বলে থাকেন। সন্তানের কথা বা মতামতকে তারা প্রাধান্য দেন না।’

যদি বাবা-মা বুঝতে পারেন যে তারা এমন কিছু করছেন তখন তাদের সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে এবং চুপ থেকে সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। যখন সন্তান দেখবে পরিবার তার কথাকে প্রাধান্য দিচ্ছে তখন সে নিজে থেকেই সব বিষয় বুঝে নিতে শুরু করবে এবং আরো কথা বলবে।

# হতাশায় ভোগা
অভিভাবকত্ব বা সন্তান লালন-পালন খুব একটা সহজ বিষয় না। বিভিন্ন কারণে প্রাত্যহিক জীবনে হতাশা ভর করেই থাকে। তবে যদি হতাশার এ কারণগুলোকে নির্ধারণ করা যায় তাহলে জীবনযাপন আরো সহজতর হবে। ড. বার্নস্টেইন এর মতে, ‘কোনো ধরনের আচরণ বা হতাশা সন্তানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনে।’ তিনি বলেন, ‘যখন বাবা-মা হিসেবে আপনি আপনার অভিভাবকত্বের হতাশার দিক বা কারণগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবেন তখন আপনার সন্তানের চ্যালেঞ্জিং আচরণ খুব দ্রুত উন্নত হবে।’

আর যখন আপনি হতাশার বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্তান ভাববে যে আপনি তার সকালের নাস্তা তৈরিতে তাকে অধিক সময় দিচ্ছেন কিংবা জুতোর ফিতে সঠিকভাবে বাঁধতে তাকে সহায়তা করছেন। নিজের কর্ম পরিকল্পনার অভাবের কারণে কখনই সন্তানকে দোষারোপ করবেন না। হতাশা তৈরির আগেই তা নিরাময়ের রাস্তা খুঁজে বের করুন।

# নেতিবাচক চিন্তায় হারিয়ে যাওয়া
প্রতিটি বাবা-মা তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনায় তাকেন। তবে যে সকল অভিভাবক ব্যর্থ তারা তাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা অনেক সময় সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশু মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং ‘টেন ডেইস টু এ লেস ডেফিয়ান্ট চাইল্ড’ বইয়ের লেখক জেফরি বার্নস্টেইন বলেন, কোনো শিশুই পরিপূর্ণ না। কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবক এটা কখনোই ভাবেন না যে, তাদের চিন্তা শিশুদের আচরণের তুলনায় তাদের অনুভূতিতে কেমন প্রভাব ফেলে।’ যেসকল অভিভাবক নিজেদেরকে এই নেতিবাচকতার চক্রে নিজেদের আবিষ্কার করতে পারেন তাদের উচিত এক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে আরো বেশি ইতিবাচক হিসেবে সাজানো।

যেমন- কোনো কাজে বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে সন্তান ব্যর্থ হতেই পারে। বা কোনো কাজে সে সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হতেই পারে। সেক্ষেত্রে তাকে দোষারোপ না করে যদি তাকে বলা হয়, যা হয়েছে তা হয়তো তোমার ভালোর জন্য হয়েছে, কিংবা যা হয়েছে সেটা তোমার জন্য ইতিবাচক ছিল না তাহলে বাবা-মা এর সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের আরো একধাপ উন্নতি হয়।

# খেলার সঙ্গীদের অবজ্ঞা করা
সন্তান যত বড় হবে সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচিত মানুষের সংখ্যা ও বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বাড়বে। খেলার সম্পর্কে বা স্কুলের পরিচয়ে কখনো কখনো এক দুইজন বন্ধুকে বাড়িতে নিয়েও আসতে পারে যার কারণে আপনি বিরক্ত হন। ড. গ্রীনবার্গ এর মতে, ‘আপনার সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে সমালোচনা করলে কিংবা তাদের অবজ্ঞা করলে তার ফলাফল হবে হিতে বিপরীত।’

অভিভাবক হিসেবে যারা ব্যর্থ তারা তাদের সন্তানের বন্ধুদের অপমান করে বা অবজ্ঞা করে। যদি আপনি আপনার সন্তানের বন্ধুদের অবজ্ঞা করেন তাহলে আপনি আপনার সন্তানকেও অবজ্ঞা করছেন। আপনার আচরণ থেকে তারা তাই শিখবে। তিনি বলেন, ‘অবজ্ঞা করা বা অপমান করার থেকে সন্তানের বন্ধুদের গুণের ব্যাপারে খোঁজ নিন।’

# সন্তানকে হীনমন্য করা
সন্তান ভুল করবেই। সেখান থেকেই তাকে শিখাতে হবে। কিন্তু যেসকল অভিভাবক সন্তানের ভুলের কারণে তাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন তারা অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ। যার কারণে সন্তান তখন নিজেকে নেতিবাচক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভাবতে শুরু করে যার কারণে মানসিকভাবে তার উন্নতি ব্যাহত হয়।

ড. বার্নস্টেইন বলেন, ‘অভিভাবকদের দায়িত্ব পুরো সপ্তাহের দিন রাত ২৪ ঘন্টা।’ যার কারণে অভিভাবকরা অনেকটা চাপের ভেতর থাকেন এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়াটাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পরে। যার কারণে তারা তাদের সন্তানের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা ভেবে থাকেন। এর ফলে অভিভাবকরা সন্তানদের অলস, স্বার্থপর, সমস্যাযুক্ত বিভিন্ন নেতিবাচক চিন্তার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। এ ধরনের ছেলেমেয়েরা তখন হতাশা, কষ্ট, রাগ এবং বিরক্তির মধ্যে ভয়ে ভয়ে অবস্থান করে। যার কারণে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তারা অনেক পিছিয়ে থাকবে।

নেতিবাচক কথা বললে বা চিন্তা করলে তা সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সন্তানের আচার-আচরণের প্রতি মনোযোগ দেয়া আবশ্যক।

# সন্তানের তুলনা করা
ব্যর্থ অভিভাবকত্বের অন্যতম একটি উদাহরণ হল নিজের সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা। হোক সে তার বন্ধু কিংবা তার আত্মীয় সম্পর্কের ভাই। এবং সেই সঙ্গে এটা আশা করা যে, সেও একইরকম আচরণ করবে বা সাফল্য অর্জন করবে।

ড. গ্রীনবার্গ এর মতে, ‘সন্তানের মধ্যে তুলনা করার পরিবর্তে প্রতিটি সন্তানের গুণকেই আলাদাভাবে প্রাধান্য দেয়া উচিত। তুলনা করার ফলে সন্তানের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় এবং নেতিবাচক প্রভাবক এর কাজ করে।’


ঢাকা, বুধবার, এপ্রিল ৪, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ২৭৪২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন