সর্বশেষ
বুধবার ৩০শে কার্তিক ১৪২৫ | ১৪ নভেম্বর ২০১৮

জাত শিল্পীর কখনো মৃত্যু হয় না

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩০, ২০১৮

Enter.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :

বাংলা গানের কিংবদন্তি ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ সৈনিক আব্দুল জব্বারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এ উপলক্ষে মহান এই শিল্পীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তাঁর একমাত্র অ্যালবামের গীতিকার  মোঃ আমিরুল ইসলাম।

যার মাতাল গায়কীর মাধুর্যে মন্ত্র-মুগ্ধ হত অগণিত দর্শক-শ্রোতা, যার ভরাট কণ্ঠের যাদুতে বাংলা গানের ইতিহাসে সূচনা  হয়েছিল সোনালি স্বর্ণালী যুগের, তিনি হলেন নন্দিত কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ  আব্দুল জব্বার। তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয় ২০০৮ সালে। আমার  লেখা ‘এখানে আমার পদ্মা মেঘনা’ গানটি তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডের পর তিনি একটি অ্যালবাম করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে এই গানটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় গান হয়ে উঠেছিল। টিভি শো থেকে স্টেজ শো – কোথাও তিনি গানটি গাইতে ভুলেন নি। এই গানটি তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গান ছিল। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে গানটি সম্পর্কে তিনি এমনটিই মন্তব্য  করেছিলেন। আমি অ্যালবামের জন্য বিভিন্ন আঙ্গিকের গান রচনা করলাম। একটি গানের  কথা ছিল এরকম - ‘আমাকে তোমাদের ভালো না লাগলেও আমার এই গান ভালো লাগবে’। গানটি পড়ে জব্বার ভাই  আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, ‘শুধু আমার কথা নয়। প্রতিটি শিল্পীর মনের কথা লিখেছ’। তিনি চেয়েছিলেন মৃত্যুর পরে তাঁকে শহীদ মিনারে নেয়ার সময় যেন গানটি বাজানো  হয়।

সঙ্গীত পরিচালক গোলাম সারোয়ার ভাই গানগুলোর সুর করলেন। ২০০৯ সালে অ্যালবামের কাজ শেষ হল। অ্যালবামের নাম ঠিক করা হল ‘মা আমার মসজিদ, মা আমার মন্দির’। জব্বার ভাই বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন চ্যানেলে অ্যালবামের গানগুলো গাইতে থাকলেন কিন্তু অ্যালবাম  রিলিজের কোন আগ্রহ দেখালেন না। সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। তাঁর শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছিল না। একদিন তাঁর ভূতের গলির বাসায় গিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের ব্যাপারে কথা বললাম। তিনি রাজি হলেন। অ্যালবামের নাম পরিবর্তন করা হল। তাঁর ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের সাথে মিল রেখে অ্যালবামের নতুন নামকরণ করা হল ‘কোথায় আমার  নীল দরিয়া’। অবশেষে গত বছরের এপ্রিল মাসে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ শিরোনামে অ্যালবামটি অনলাইনে মুক্তি পেল। সৃষ্টি হল আব্দুল জব্বারের প্রথম এবং একমাত্র মৌলিক গানের অ্যালবাম।  তাঁর এই সৃষ্টিকর্মের সাথে সারাজীবনের জন্য যুক্ত হয়ে গেলাম।

আমার লেখা ‘বাংলাদেশের হৃদয় তুমি, তুমি বাংলার মিতা/আমরা সবাই একটি জাতি তুমি জাতির  পিতা’ গানটি ছিল সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর ওপর আব্দুল জব্বারের গাওয়া শেষ গান। মৃত্যুর কিছুদিন  আগে তিনি  বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কয়েকটি গান লিখতে বলেছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু দেখেছি তোমায়, দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ/হায়েনাদের তুমি তাড়িয়ে দিয়ে করেছ মাটি শুদ্ধ’ – এমন কথার একটি গান লিখেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর গানটি রেকর্ড করা হল না। তার আগেই তিনি চিরতরে ডুব দিলেন তাঁর প্রিয় নীল দরিয়ায়। বঙ্গবন্ধুর ওপর লেখা গানের একটি অ্যালবাম করার অভিপ্রায় ও তিনি ব্যক্ত করেছিলেন।

অ্যালবামের কাজ করতে গিয়ে আব্দুল জব্বারকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর অস্তিত্ব জুড়ে ছিল নিখাদ নির্ভেজাল দেশপ্রেম। আর এই প্রবল প্রমত্ত দেশপ্রেমের টানেই তিনি মৃত্যুকে ভ্রূকুটি করে একাত্তরের রণাঙ্গনে দীপ্তকণ্ঠে গর্জে উঠেছিলেন, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ বলে। নতুনদের জন্য তিনি ছিলেন এক বড় প্রেরণা, বিরল আদর্শ। আমাকে তিনি প্রায় প্রায় বলতেন, ‘আমিরুল, গান লিখে যাও। কবি নজরুল খেয়ে না খেয়ে গান লিখে গেছেন’।

বর্তমান দশকের গীতিকার হিসেবে আব্দুল জব্বারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। পরিচয়ের  পর থেকে  মৃত্যু অবধি আমি তাঁর পাশে ছিলাম। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সাথে জড়িয়ে আছে আমার অজস্র স্মৃতি। কখনো স্টুডিওতে, কখনো বিটিভিতে , কখনো বা তাঁর নিজগৃহে। সেসব স্মৃতির মিছিলে অশ্রুসজল চোখে কেবলি হাতড়ে বেড়াই তাঁকে।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আব্দুল জব্বার চিরবিদায় নিয়েছেন সত্য। জাত শিল্পীর কখনো মৃত্যু হয়না। তিনি এই বাংলায়  ছিলেন, আছেন, থাকবেন। আজো বাংলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয় তাঁর চিরচেনা কণ্ঠ – ‘হাজার বছর পরে /আবার এসেছি ফিরে/বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে’। লক্ষ কোটি যোজন দূরে থেকেও নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে বাংলা গানের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে তিনি জ্বলজ্বল করে জ্বলবেন যুগযুগ ধরে। এখনো আমি কান পেতে শুনতে পাই তিনি যেন আমাকে বলছেন,  ‘আমিরুল, আমার জন্য গান লেখো’। আমি আর কোনদিন তাঁর জন্য গান লিখব না। ব্যথায় বিষাদে অশ্রুতে ভিজে আমার  কলম বারবার থেমে যেতে চায়।                          


ঢাকা, বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩০, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // উ জ এই লেখাটি ৪৬৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন