সর্বশেষ
বুধবার ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ২১ নভেম্বর ২০১৮

রুবেলকে ঘিরে 'মাইন্ড গেম' খেলছে ভারত!

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১২, ২০১৫

1746738095_1426139909.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
এখন আর কাছে গিয়ে টিভির নব ঘোরাতে হয় না। দূর নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের মাধ্যমে দূর থেকেই পরিবর্তন করা যায় চ্যানেল। এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে উড়ে যেতে সময় লাগে না তাই। তা যেকোনো ভারতীয় সংবাদ চ্যানেলেই যান না কেন, খেলার খবরে অবধারিতভাবে দেখতে পাবেন রুবেল হোসেনের ছবি। যত না তার কীর্তির জন্য, এর চেয়ে বেশি দেশে অভিযোগ থেকে মুক্তির সৌজন্যে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে সংবাদপত্র হাতে নিয়ে দেখারও প্রয়োজন পড়ে না। অন্তর্জালের দুনিয়ায় ঢুকে কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখ রাখলেই চলে। সেখানে গিয়ে ভারতীয় পত্রপত্রিকাগুলো দেখুন। খেলার খবরে রুবেলের উপস্থিতি অনিবার্য। আর তাতে টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তাদের ভাষাও অভিন্ন। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার নায়ককে প্রচ্ছন্নে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা। এক অভিনেত্রীর দায়ের করা মামলায় যে বিশ্বকাপ-যাত্রার আগে রুবেলের জেল-যাত্রা হয়েছিল, ইনিয়ে-বিনিয়ে সেটিকে মুখ্য করার প্রচেষ্টা তাদের। ‘মাইন্ড গেম’ কি তাহলে শুরু করে দিল ভারতীয় গণমাধ্যম!

ক্রিকেট খেলায় এই মনস্তাত্ত্বিক খেলার ইতিহাস প্রাচীনকালের। আগে দুই দলের মধ্যেই সীমিত থাকত। দুই অধিনায়ক হয়তো কথার তুবড়ি ছোটাচ্ছেন, মাঠে নামার আগে হয়তো চাইছেন একে-অপরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে- গণমাধ্যমের কাজ সেখানে কেবলই বার্তাবহনের। দুই দলের বার্তা পরস্পরের কাছে এবং ক্রিকেটপ্রেমী দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। হালে সেই ধারাটা বদলে গেছে অনেকটা। এখন গণমাধ্যম আর শুধু নিরপেক্ষ প্রচারযন্ত্র না, বরং কোনো এক পক্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ারও। অস্ট্রেলিয়া সফরে বিদেশি দলগুলো পায় তেমন ‘অভ্যর্থনা’। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের ‘অ্যাশেজ’ কিংবা অস্ট্রেলিয়া-ভারতের বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির দ্বৈরথের সময় ব্যাপারটি ওঠে তুঙ্গে।

এবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ যখন বাংলাদেশ, তখন সে দেশের গণমাধ্যমই-বা বসে থাকবে কেন! ইংল্যান্ড-বধের নায়ক রুবেলের বিশ্বকাপ-পূর্ব ঝঞ্ঝাটের কথা প্রচার করছে তারা ফলাও করে। আসলে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের একটু বাড়তি সুবিধা দিতেই এই চেষ্টা! বাংলাদেশের কাছে হেরে ২০০৭ বিশ্বকাপে পাততাড়ি গোটাতে হয়েছিল ভারতকে। এবার তাই হয়তো কোনো সীমান্তেই ন্যূনতম ফোকর আর রাখতে চায় না তারা!

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সময় পেসার রুবেলের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঝড়। নাজনীন আক্তার হ্যাপি নামের এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর দায়ের করা প্রতারণার মামলার জেরে জেল পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়েছে তাকে। অনিশ্চিত হয়ে যায় বিশ্বকাপ খেলা। অবশেষে যখন সে নিশ্চয়তা পেলেন, প্রতিদান দেওয়ার জন্য মুখিয়ে বাগেরহাটের এ পেসার। আর সেটি কী দারুণভাবেই না দিলেন! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ওই শেষ দুটো বোল্ড বাংলাদেশের ক্রিকেট-রূপকথার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেল পাকাপাকিভাবে।

কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করা ম্যাচে অমন পারফরম্যান্সের পর রুবেল হয়ে যান জনতার নায়ক। তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ওই অভিনেত্রীও রুবেলের বিপক্ষে করা মামলা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন। ব্যস, ভারতীয় গণমাধ্যম পেয়ে যায় খোরাক। এটিকেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করছে তারা। কলকাতার ট্যাবলয়েড ‘এবেলা’য় রুবেল-হ্যাপির ছবি দিয়ে শিরোনাম, ‘মামলা তুলে নেবে হ্যাপি’। দৈনিক ‘এই সময়’-এর বক্স নিউজ, ‘রুবেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা তুলছেন হ্যাপি’। টাইমস অব ইন্ডিয়া সংবাদ শিরোনাম করেছে এভাবে, ‘বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড কাপ হিরো রুবেল রেইপ কেস ইম ড্রপড’। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ভাষায়, ‘‘বাংলাদেশ অ্যাকট্রেস ‘ফরগিভস’ রুবেল হোসেন, উইথড্রস রেপ অ্যালিগেশন’’। টেলিগ্রাফইন্ডিয়া লিখেছে যেমন, ‘হিরোইকস কাম টু রুবেল’স রেসকিউ’।

কিন্তু এসবে কি আর ভড়কে যাবে বাংলাদেশ! দলের ফুরফুরে পরিবেশ কিন্তু সে কথা বলছে না। বিশ্বকাপের আগে যখন রুবেলের বিপক্ষে অভিযোগ আলোয় আসে, তখন জাতীয় দলসংশ্লিষ্ট সবার মুখে ছিল কলুপ আঁটা। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথাই বলেননি তার সতীর্থরা। কিন্তু সেই পরিস্থিতি যে বদলে গেছে কতটা, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মাশরাফি বিন মর্তুজার কথাতেই এর প্রমাণ। ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সে সতীর্থের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘এমন পারফরম্যান্সের পর রুবেল এখন নিশ্চয়ই হ্যাপি।’ আর ‘হ্যাপি’ বলার সময় মাশরাফির দুষ্টুমিমাখা কণ্ঠস্বরটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি বাংলাদেশের কারো।

বুঝতে কেবল অসুবিধা হচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যমের। রুবেলের সেই ব্যক্তিগত সমস্যা সামনে এনে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে জেতার কোনো উপায় নেই। কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কাছে এখন তা হালকা হয়ে গেছে অনেকটাই। কোয়ার্টার ফাইনালে এর বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। বরং ভারতীয় গণমাধ্যমের ওই মনস্তাত্ত্বিক চালে আরো তেতে উঠতে পারে রুবেল ও তার সতীর্থরা।

হ্যাপি-অধ্যায়ের খোঁড়াখুঁড়ি করে ভারতীয় গণমাধ্যম তাদের জন্য বিশ্বকাপে আরেকটি ‘আনহ্যাপি’ মুহূর্তের প্রেক্ষাপটই তৈরি করছে কি না, কে জানে!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, মার্চ ১২, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি ৭৩২৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন