সর্বশেষ
সোমবার ৯ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভারতের জয় চান তসলিমা!

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৯, ২০১৫

482081261_1426705637.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বাংলাদেশ-ভারত কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে যখন আলোড়িত দুই দেশ, সমর্থকরা যখন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন নিজ নিজ দলের পক্ষে গলা ফাটানোর জন্য, তখন কলকাতার এক পত্রিকায় কলাম লিখে আবারও বিতর্কিত হলেন তসলিমা নাসরিন। বুধবার কলকতার ‘এই সময়ে’ লেখা তার সেই বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘আন্ডারডগ’ আখ্যায়িত করে লিখেছেন, ভারত জিতলেও তিনি খুশি হবেন।

বিশ্বকাপ না কি তিনি খুব উপভোগ করছেন। ভারতের কঠিন সমর্থক। ভারত জিতলে কিলো কিলো মিষ্টি কিনে পড়শিদের খাওয়াচ্ছেন। আবার না কি বাংলাদেশ জিতলেও মিষ্টি কিনে পড়শিদের খাওয়ান।

শুধু তাই নয়, ওই বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ দলকে ‘চুনোপুটি’ও আখ্যা দিয়েছেন তসলিমা। সঙ্গে ‘মওকা মওকা’ বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ তুলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও কটাক্ষ করতে ছাড়লেন না তিনি।

এই সময়ে লেখা তসলিমা নাসরিনের সেই বিশেষ প্রতিবেদন হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো…

‘বিশ্বকাপের খেলা দেখছি , বিশেষ করে ভারত বা বাংলাদেশের খেলা যখন চলছে। ভারত জিতছে আর কিলো কিলো মিষ্টি কিনে পড়শিদের খাওয়াচ্ছি। বাংলাদেশ জিতছে , আর একইভাবে মিষ্টি বিতরণ চলছে। রসগোল্লা, সন্দেশ, ছানার জিলিপি, রাজভোগ, রসমালাই, চন্দ্রপুলি…।

অনেকেই জিজ্ঞেস করছে, উনিশ তারিখ ভারত-বাংলাদেশের খেলায় আমি কোন পক্ষ নেব? আমি কোনও দলের পক্ষে অন্ধের মতো চেঁচানোর বদলে খেলাটা উপভোগ করতে পছন্দ করি। নিউজিল্যান্ড আর বাংলাদেশের খেলাটা খেলা হিসেবে বেশ ভালো ছিল, যদিও বাংলাদেশ হেরেছে। শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের খেলাটা খেলা হিসেবে মনে হয়নি খুব ভালো হয়েছে।

জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ভারতের খেলাটা বেশ চমৎকার! কী করে প্রায় হেরে যেতে যেতে জিতে গেল ভারত, দেখার মতো। এখন অপেক্ষা করে আছি, ভারত আর বাংলাদেশের খেলা দেখতে। ভারত-পাকিস্তান খেলা মানে ভীষণই উত্তেজনা, অন্য কোথাও না হলেও এই উপমহাদেশে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে আরও একটি দেশ যোগ দিয়েছে উত্তেজনার খেলায়, সে বাংলাদেশ।

‘মওকা মওকা ’ বলে পেপসিকোলা একটা অ্যাড বানিয়েছে ভারতে, ওতে লেখা ‘ইন্ডিয়া ক্রিয়েটেড বাংলাদেশ’। তা দেখে বাংলাদেশের লোকেরা খচে লাট্টু। তারা মোটেও বিশ্বাস করে না ভারত বাংলাদেশকে জন্ম দিয়েছে, বা নির্মাণ করেছে। একাত্তরের যুদ্ধটা হয়েছিল বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে, যুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছে ভারত, এই যা। এ দিকে, ভারত বিশ্বাস করে, যুদ্ধটা ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, পাকিস্তানকে হারিয়েছে ভারত, হারিয়ে নতুন একটা দেশ তৈরি করেছে , বাংলাদেশ নাম।

যদিও ভারতের সাহায্য ছাড়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশের জেতার কোনও সম্ভাবনা ছিল না, তারপরেও বাংলাদেশের মানুষ অহঙ্কার করে বলে, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছে।’ তারা মনে করে, যুদ্ধটা মূলত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধটা একটা বিশাল গৌরবের ব্যাপার। এ, সত্যি বলতে কী, তাদের কাছে এক ধরনের আইডেনটিটি। তারা জানে, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি পাকিস্তানপন্থী ইসলামি মৌলবাদী গোষ্ঠী ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, এ সময় নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আঁকড়ে থাকতে হবে।

ঊর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার শাসক আর নেই বটে , তবে ঘরের শত্র“ বিভীষণের অভাব নেই। এখন আরবি ভাষা আর সংস্কৃতি আমদানি করার ষড়যন্ত্র চলছে।

ভারতের ‘মওকা মওকা ’ অ্যাডের উত্তরে প্রচুর অ্যাড বানিয়েছে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা। তারা বোঝাতে চাইছে, উনিশ তারিখের খেলাটায় বাংলাদেশ হারিয়ে দেবে ভারতকে, ঠিক যে ভাবে ২০০৭ সালে তারা ভারতকে হারিয়েছিল, শুধু হারানো নয়, ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে একেবারে বিদায় করে ছেড়েছিল। এবার বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে মনে জোর পেয়েছে, টপ ফেভারিট নিউজিল্যান্ডকেও ঘাম ছুটিয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা আছে তার। তাই বলে বেড়াচ্ছে ভারতকে তারা হারাবেই হারাবে।

ক্রিকেটের জগতে ভারত হলো বাংলাদেশের দাদা। দাদাগিরিটা ভারত কিন্তু করতে ভুলছে না। চুনোপুঁটির কাণ্ড দেখে হাঙ্গর যেমন হাসে, তেমনই হাসছে। ভারতের যাকেই জিজ্ঞেস করছি , ‘কে জিতবে , ভারত নাকি বাংলাদেশ?’ তুমুল হেসে বলছে , ‘অবশ্যই ভারত।’ ভারত জিতবে এ নিয়ে ভারতের কারও একবিন্দু সন্দেহ নেই। আর সে দিনকার বাচ্চা খেলোয়াড়রা এসেছে কি না বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতকে চ্যালেঞ্জ করতে! স্পর্ধা দেখে বাঁচি না।

সেদিন বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ডের খেলায় দেখলাম ভারতের অনেকে নিউজিল্যান্ডকে সমর্থন করছে। পাশের দেশকে না সমর্থন করে, দূরের দেশকে কেন, জিজ্ঞেস করায় কী সব হাবিজাবি যুক্তি দেখাল। পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই লক্ষ্য করছি বাংলাদেশের পক্ষে। তারা বলছেও , ‘এগারোজন বাঙালি খেলছে , খুব গর্ব হচ্ছে বাঙালি হিসেবে !’

আমি ভালো খেলা এনজয় করি , আর লুকোবো না , আন্ডারডগকে সাপোর্ট করার একটা বাতিক আছে আমার। এই বাতিকের কারণেই ভারত আর বাংলাদেশের খেলায় বাংলাদেশকে সমর্থন করব , কিন্তু ভারত যদি ভীষণ ভালো খেলে , ভারতের জেতায় খুশি হব না , তা কি হয়? আন্ডারডগ হয়েছে বলে জঘন্য খেললেও তালি বাজাব, তা পারব না।

সামনে উনিশ তারিখ। রীতিমতো উৎসব করে খেলা দেখব। আমার বাড়িটাকেই একটা ছোটখাট স্টেডিয়াম বানিয়ে ফেলব। টুইটারে অলরেডি জানিয়ে দিয়েছি আমার প্ল্যান। প্রচুর মিষ্টি কিনব। আমার সঙ্গে বেশ কয়েকজন ভারতীয় ক্রিকেটপাগল লোক খেলা দেখবে। কথা হয়ে গেছে তাদের সঙ্গেও, বাংলাদেশ একটা উইকেট নেবে, মিষ্টি। ভারত ছক্কা মারবে, মিষ্টি। এই ভাবে মিষ্টি খেতে খেতে খেলা দেখা হবে।

তারপর সমাপ্তিতে যে দলই জিতুক, ননস্টপ মিষ্টি খাওয়া চলবে। প্ল্যানটা মন্দ নয়। কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে, বাংলাদেশে আমার জন্ম , বেড়ে ওঠা, আমি কেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত জিতলে খুশি হব বা মিষ্টি খাওয়াব মানুষকে। ভারতে থাকি বলে কি পক্ষপাত? আমার কিন্তু মনে হয় না। ভারতের টিম আমার অল টাইম ফেভারিট। বাংলাদেশ নতুন দল। দলটিকে এখনও অনেক খেলতে হবে ভালো খেলা খেলতে গেলে।

আন্ডারডগকে সাপোর্ট করি বলে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ জিতলে খুশি হব, আর ভারত জিতলে ফেভারিট টিম জিতলে অখুশি হওয়ার কোনও কারণ নেই, খুশিই হব। সম্ভবত আমি জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে ওঠা মানুষ। তাই বাংলাদেশ আর শ্রীলংকা যখন খেলেছিল, শ্রীলংকা ভালো খেলেছিল বলে চাইছিলাম শ্রীলংকা ভালো খেলার পুরস্কার পাক, জিতুক। একেবারে নিরপেক্ষ হয়ে খেলা দেখার মজাই আলাদা।

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৯, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এম এস এই লেখাটি ২২০৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন