সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৫ নভেম্বর ২০১৮

সৌম্য ও তাসকিনের একান্ত কিছু কথা

শনিবার, মার্চ ২৮, ২০১৫

1025422874_1427538913.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :
অনেক প্রাপ্তি নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন থেকে ফিরেছে বাংলাদেশ দল। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি সৌম্য সরকার, ও তাসকিন আহমেদ। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে দারুণভাবে চিনিয়েছেন দুই তরুণ। তাদের পথচলা হোক আরো প্রশস্ত। আজ জেনে নিন সৌম্য ও তাসকিনের একান্ত কিছু কথা

দুরন্ত তাসকিন
বাংলাদেশ দল ভালো খেলেছে, ছেলে ভালো খেলেছে, ভীষণ খুশি তাসকিনের মা সাবিনা ইয়াসমিন। শুধু তার মা নয়, তার এই অর্জনে পরিবার, আত্মীয় ও মহল্লার সবাই খুব খুশি।

ছোটবেলায় খেলা শুরু জাকির হোসেন রোডের গলিতে। বেশির ভাগ সময় বোলিংয়ের পর বড় ভাইয়েরা আমাকে ব্যাটিং দিতেন না। এরপর মাঠে যখন যেতাম, বড় ভাইয়েরা আমাকে নিতেন 'দুধভাত' হিসেবে। এমনি দাঁড়িয়ে থাকতাম। সবাই কিন্তু ব্যাটিং করতেই পছন্দ করে। একদিন বললাম, ঠিক আছে শুধু বোলিং করি? এভাবেই বোলার হয়ে ওঠার গল্প সে নিজেই বললো।

বাবা আবদুর রশিদের কাছ থেকে জানা যায়, 'ওর বয়স ছয়-সাত। বাণিজ্য মেলায় নিয়ে গিয়েছিলাম। অন্য বাচ্চাদের শখ থাকে খেলনা কেনা। তার শখ ব্যাট-বল কেনা। এভাবেই ব্যাট-বলের সঙ্গে ওর সখ্য। একদিন দুপুরে বাসায় ফিরে দেখি বাসায় নেই। মাঠে খেলছে। ওখানেই ব্যাট দিয়ে মেরেছিলাম! কিন্তু তাতে যেন ক্রিকেটের সঙ্গে সখ্য আরো বাড়ল।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সিঁড়ি ভেঙে ২০১২ সালে খেলতে গেলেন অস্ট্রেলিয়ায় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। তবে ডানহাতি পেসারের টার্নিং পয়েন্ট ২০১৩ সালের বিপিএল। ওই টুর্নামেন্ট দিয়েই প্রথম আলোচনায় এলেন তাসকিন।

কিন্তু এরপরই এক দুঃসংবাদ। চোটের কারণে দেড় বছর খেলার বাইরে থাকতে হয়। অতঃপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক গত বছরের এপ্রিলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। দারুণ গতিতে বল করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন প্রথম ম্যাচেই। এরপর একই বছর জুনে ওয়ানডেতে ভারতের বিপক্ষে সেই হিরণ্ময় অভিষেক। সে ম্যাচে নিয়েছিলেন ২৮ রানে ৫ উইকেট।

এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি তাসকিন। ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে বললেন, 'আমার বিশ্বাস, যতটুকু পেরেছি এর চেয়েও বেশি করতে পারতাম। তবে যা হয়েছে তার জন্য খুশি। এর চেয়ে বড় ব্যাপার, বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে। আর জীবনের প্রথম বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পেরেছি বলে আরো বেশি ভালো লাগছে।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে দুই মাস কেটেছে স্বপ্নের মতো। নিশ্চয় অনেক মুহূর্ত জমা হয়েছে মনে। এর মধ্যে সবচেয়ে তার সেরা মুহূর্ত জানালেন, 'প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত গাওয়া আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ জেতার পর উদযাপন।

ভারতের বিপক্ষে অজিঙ্কা রাহানেকে ফিরিয়ে মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে দুর্দান্ত এক উদযাপন করেছিলেন তাসকিন। এটিকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা উদযাপন বললেও অত্যুক্তি হবে না।

অল্প সময়ের মধ্যেই চলে এসেছেন লাইমলাইটে। তবে এ তারকাখ্যাতি কিছুতেই বড় করে দেখতে রাজি নন তাসকিন, 'আসলে নিজের ব্যাপারে আমি একেবারেই স্বাভাবিক, সাদামাটা। এককভাবে কিছুই অর্জন করতে পারিনি। এখনো অনেক কিছু করার আছে।' এ রকমটাই বললেন।

সাবলীল সৌম্য
'গত মৌসুমে প্রাইম ব্যাংকে একসঙ্গে খেলার আগে আমি ওর খেলা তেমন দেখিনি। খালি শুনতাম, সৌম্য-সৌম্য। একসঙ্গে খেলে দেখলাম, ওর খেলাটা খুব সাবলীল।' বলেছেন মাহমুদউল্লাহর। হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ে মাহমুদউল্লাহকে দারুণ সঙ্গ দিয়েছিলেন সৌম্য সরকার। ম্যাচের পর প্রতিবেদককে দেয়া এক সাক্ষাতকারে সৌম্যকে এমনই প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ।

শুধু মাহমুদউল্লাহ কেন, প্রত্যয়দীপ্ত ব্যাটিং, দৃষ্টিনন্দন সব শটে আলাদা নজর কেড়েছেন সৌম্য। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনেক প্রাপ্তি আছে। এর মধ্যে অন্যতম সৌম্য, এক অর্ধশতকসহ ছয় ম্যাচে ২৯.১৭ গড়ে ১৭৫ রান করা সৌম্যের মধ্যে দারুণ ভবিষ্যৎ দেখছেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে।

কেবল ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফরম্যান্সে সুযোগ পেয়েছিলেন বিশ্বকাপ দলে। বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে চমকই ছিলেন সৌম্য। মাত্র একটি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলতে নামলেন ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে!

প্রথম বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে বললেন, 'প্রথম যেদিন খেলতে নামলাম (আফগানিস্তানের বিপক্ষে), সেটি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত। শুরু থেকেই রোমাঞ্চিত ছিলাম। তবে চাপ না নিয়ে উপভোগ করেছি সবকিছু।

বাবা কিশোরী মোহন সরকার এখন নড়াইল শিক্ষা অফিসে কর্মরত। দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে। বাবার কখনো স্বপ্ন ছিল না ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন। চেয়েছিলেন পড়াশোনাটাই ঠিকঠাক করুক। তবে ছেলে যে মন দিয়ে ফেলেছে ক্রিকেটকেই।

সেটি কিশোরী মোহন আবিষ্কার করলেন দ্রুতই, 'স্কুলে ভর্তি করার পর দেখলাম, পড়াশোনার চেয়ে খেলার প্রতি টানই বেশি তার। কিন্তু স্কুলশিক্ষক হিসেবে তখনো ভাবিনি তাকে ক্রিকেটার হিসেবে তৈরি করব। এর জন্য অনেক বকা দিতাম। তবে কাজ হতো না। মাঠে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলা দেখত। উপায় না দেখে বললাম, তোমার যদি খেলা ভালো লাগে, তবে খেলো।

ব্যস, বাবার প্রেরণায় সৌম্যর নতুন পথচলা শুরু। সৌম্যর বড় ভাই পুষ্পেন সরকারও ক্রিকেট খেলতেন। পুষ্পেন খেলেতন স্থানীয় এক ক্লাবে। সৌম্য তখন পুষ্পেনের সঙ্গে ওই ক্লাবে যাওয়া শুরু করলেন। পুষ্পেনই সৌম্যকে একদিন ব্যাটিং অনুশীলনের সুযোগ করে দিলেন। সৌম্যের ব্যাটিং দেখে ক্লাবের কোচিং স্টাফরা রীতিমতো মুগ্ধ!

বিকেএসপিতে ভর্তির চেষ্টা করা হলো। প্রথমবার সুযোগ পেলেন না বিকেএসপিতে। পরেরবার, ২০০৬ সালের মে মাসে আবার পরীক্ষা দিয়ে দারুণ ফল করে সুযোগ মিলল।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিকেএসপির অধ্যক্ষ একটি চিঠি পাঠালেন সৌম্যর বাবাকে। অধ্যক্ষ জানালেন, খেলায় খুব ভালো। এ কারণে সৌম্যর জন্য মাসিক টাকাটা মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে।’ বিকেএসপিতে দুবার সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন সৌম্য।

এমনিতে সৌম্য ভীষণ লাজুক, স্বল্পভাষী। বাবা বললেন, যদি ওকে জিজ্ঞেস করতাম, অনুশীলন কেমন হয়েছে? বলবে, হয়েছে’। ব্যস, এতটুকুই! এর বেশি একটা কথাও বলবে না। যদি জিজ্ঞেস করতাম, আউট হলে কীভাবে? বলবে, 'ব্যাট-বলে টাইমিং হয়নি!' এর বেশি ব্যাখ্যা সে দেবে না। তার মা বাদে পৃথিবীর সবার কাছেই সে লাজুক।

বিশ্বকাপ শেষে এ মুহূর্তে সৌম্য সময় কাটাচ্ছেন নিজ বাড়ি সাতক্ষীরায়। এলাকায় ফিরে পেয়েছেন রাজসিক অভ্যর্থনা।

সৌম্য বিশ্বকাপ নিয়ে খেলা প্রসঙ্গে বলেছেন, 'দল প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত। দলের সাফল্যের মধ্যেও মনে একটা আক্ষেপ থেকে গেছে, 'স্বপ্নটা অনেক বড়ই ছিল। সেটা সেভাবে পূরণ হয়নি। চেয়েছিলাম এমন ইনিংস খেলব, যেটি মানুষ বহুদিন মনে রাখবে। চেয়েছিলাম বিশ্বকাপে নিজেকে চেনাব' সেটা পুরোটা হয়নি।'

ঢাকা, শনিবার, মার্চ ২৮, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ৫৪০০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন