সর্বশেষ
শনিবার ৭ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রকৃতি যেভাবে ভূমিকম্পের আগাম খবর দেয়

রবিবার, মে ৩, ২০১৫

755876563_1430629640.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
প্রচন্ডভাবে কেঁপে উঠেছিল মাটি। গুঁড়িয়ে গিয়েছিল বহু বাড়ি-ঘর। কিন্তু একজনেরও মৃত্যু হয়নি ৭.৩ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে। ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের। চীনের হাইচেং প্রদেশের। ঠিক তার পরের বছর, ১৯৭৬ সালে চীনেরই তাংশাং প্রদেশে ৭.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ।

একই দেশে একটি প্রদেশে ভূমিকম্প এতগুলো প্রাণ কেড়ে নিল, আবার সেই দেশেরই অন্য প্রদেশে প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি! এটা কিভাবে সম্ভব? তা হলে কি বিজ্ঞানীরা কোনো পূর্বাভাস দিয়েছিলেন?

না, হাইচেং প্রদেশের ক্ষেত্রে এ রকম কোনো পূর্বাভাস তারা দেননি। তবে প্রকৃতি ঠারেঠোরে সতর্ক করেছিল। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হাইচেংয়ে বড় মাপের ভূমিকম্পের আগে গোটা এলাকায় মাস খানেক ধরে অনেক ছোট ছোট কম্পন হচ্ছিল। ভূবিজ্ঞানের ভাষায়, এদের বলা হয় ফোর-শক বা ভূমিকম্প-পূর্ব কম্পন। এই কম্পনের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ভয় পেয়ে আগেভাগেই সরিয়ে দিয়েছিল বাসিন্দাদের। তাংশাংয়ের ক্ষেত্রে যদিও সতর্ক হওয়ার সুযোগই মেলেনি।

তবে শুধু প্রকৃতি নয়, ভূকম্প নিয়ে আগাম সতর্ক করতে পারেন বিজ্ঞানীরাও। কিভাবে?

ভারতের খড়্গপুর আইআইটি-র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষকরা বলছেন, এর একটি বিশেষ পদ্ধতি আছে। ৩০০ বছরের মধ্যে কোনো ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় যদি ছ’বার রিখটার স্কেলে সাত বা তারও বেশি মাত্রার কম্পন ধরা পড়ে, তবে প্রতি পঞ্চাশ বছরে সেখানে বড় মাত্রার কম্পনের আশঙ্কা (শতকরা ৫০ ভাগ) থাকে। রিখটার স্কেলে তার মাত্রা হতে পারে সাত বা আরও বেশি।
সেই হিসেবেই আসাম-মেঘালয়-অরুণাচলপ্রদেশের মতো এ দেশের সব থেকে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ফের একটা বড় কম্পনের সময় এসে গিয়েছে বলে মনে করেন তারা। তবে তার উৎস বা দিনক্ষণ হিসেব করে আগাম বলে দেওয়ার কোনও পদ্ধতি এখনও আবিষ্কার হয়নি বলেই জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

খড়্গপুর আইআইটি-র ভূ-পদার্থবিদ শঙ্করকুমার নাথ ও কম্পন-নিরোধক বাড়ি তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণারত অধ্যাপক দামোদর মাইতির ব্যাখ্যা, বিভিন্ন টেকটনিক প্লেটের মধ্যে ঘর্ষণে ওই সব প্লেটের সংযোগস্থলে ছোট ছোট ফাটল তৈরি হয়। তাদের বলে চ্যুতি।
বড় চ্যুতিগুলিকে বলা হয় খোঁচ। নিরন্তর ঘর্ষণে তাদের মধ্যে শক্তি সঞ্চিত হয়।

ওই সব চ্যুতি এবং খোঁচ কোথায় রয়েছে, ভূ-বিজ্ঞানীরা সেটা শনাক্ত করতে পারেন। যেখানে এই ফাটল আছে, সেই এলাকাগুলিকে ভূমিকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হয়। চ্যুতি এবং খোঁচে কত পরিমাণ শক্তি জমা হচ্ছে তারও আগাম আঁচ পেয়ে যান ভূ-বিজ্ঞানীরা। শক্তির সঞ্চয় দেখে কোনও এলাকায় অদূর ভবিষ্যতে কত মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, সেই পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

ভারতে কোথায় কোথায় এই ধরনের চ্যুতি বা খোঁচ রয়েছে তার মানচিত্র তৈরি করেছে ভারতের ভূতত্ত্ব সর্বেক্ষণ। তার ভিত্তিতেই আসাম-মেঘালয়-অরুণাচলপ্রদেশকে সব চেয়ে ভূকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দামোদরবাবু বলেন, আসাম-শিলং-অরুণাচলপ্রদেশে এমন অনেক চ্যুতি এবং খোঁচ রয়েছে যেখানে অনবরত শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। গত ৬০ বছরে ওই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতের ফাটলগুলিতে ইতিমধ্যেই প্রবল পরিমাণ শক্তি জমা হয়েছে। হিসেব অনুযায়ী, সেখানে বড় মাত্রার আর একটি কম্পন হওয়ার সময় চলে এসেছে বলেই মনে করেন আইআইটি-র ওই প্রযুক্তিবিদ।

ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার চীন ও অরুণাচল সীমান্ত, আসামের যোরহাট ও শোণিতপুর এবং নাগাল্যান্ডে কম মাত্রার কয়েকটি ভূকম্প হয়েছে। শুধু গত মাসেই উত্তর-পূর্বে এই ধরনের কম্পনের সংখ্যা ১১টি। তবে তা ‘ফোর-শক’ কি না, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি ভূ-বিজ্ঞানীরা।

তা হলে ‘ফোর-শক’-এর উৎস কী?

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কোনো বড় মাত্রার কম্পনের আগে ফোর-শক হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাটির নীচে টেকটনিক প্লেটগুলি কিভাবে নড়াচড়া করছে তার উপরে। তাই কোথায় কোথায় ফোর-শক হবে আর কোথায় হবে না— এই পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। ‘‘সব ভূমিকম্পের আগে ফোর-শক হয় না। তাই ছোটখাটো কম্পন মানেই ফোর-শক, এমনটাও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়’’, মন্তব্য এক ভূ-বিজ্ঞানীর।

ঢাকা, রবিবার, মে ৩, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // আর কে এই লেখাটি ২৯০১ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন