সর্বশেষ
সোমবার ৯ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

মাশরাফির নেশা!

মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০১৫

1451158924_1438708786.png
বিডিলাইভ ডেস্ক :
সৈয়দ রাসেলের কথাটা শুনে মাথায় বাজ পড়ার মতো একটা অনুভূতি হয়েছিলো।

ঠিক শুনেছি কি না, বোঝার জন্য আবার প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কী বললেন!’

‘ঠিকই বলেছি। আপনি ঠিকই শুনেছেন। মাশরাফির একটা নেশা আছে।’

নিজে প্রায় এক যুগ ধরে এই মানুষটাকে চিনি। তার জন্ম থেকে চেনেন, এমন অন্তত ডজন খানেক লোকের সঙ্গে গল্প হয়েছে। কিন্তু মাশরাফির নামে এই অভিযোগ তো কখনো শোনা যায়নি!

আরও একটু ব্যাখ্যার জন্য রাসেলকে চেপে ধরতেই একগাল হাসলেন মাশরাফির এই ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও দীর্ঘদিনের বোলিং পার্টনার, ‘মাশরাফির নেশা হলো বন্ধুত্ব’। মানুষ জীবনের প্রতিটা ধাপে নতুন নতুন নেশা করে; ও বন্ধুত্বের নেশা করে। যেখানে যায় বন্ধু তৈরী করে। বন্ধু ছাড়া একটা দিনও বাঁচতে পারবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, ও সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যে জায়গায় যতো বন্ধু তৈরী করেছে, সবগুলো সম্পর্ক ধরে রাখে। এটা হলো বিস্ময়কর ব্যাপার।’

হ্যা, মাশরাফির বন্ধুত্ব একটা বিষ্ময়কর ব্যাপারই বটে।

বন্ধু সবারই কম বেশী আছে। ফেসবুকের ‘পাচ হাজার বন্ধু’ ব্যাপারটার কথা বাদ দিলে; কারো বন্ধু সংখ্যা, রোজকার সম্পর্ক রাখা বন্ধু সংখ্যা দশের ওপরে যাওয়াটা খুব কঠিন। আসলে সমাজ গবেষকরাই বলেন, একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার ওপরে মানুষের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান ফ্রেন্ডশিপ’ মানুষের পক্ষে ধরে রাখা সম্ভব না।

মানুষের মস্তিষ্কের গঠনই নাকি এমন যে, সে অধিক সংখ্যক মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখতে পারে না।
কিন্তু মাশরাফি তো সেই মানুষ, যিনি বহু আগেই চিকিৎসাবিদ্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। মাশরাফি তো সেই মানুষ, যিনি বহু আগেই বইয়ে পড়া অনেক কথাকেই মিথ্যে প্রমাণ করেছেন। ফলে এসব সমাজ গবেষকদের জন্য তিনি যে এক ব্যতিক্রমের উদাহরণ হয়ে থাকছেন, তাতে আর বিষ্ময়ের কী আছে!

একেবারে সরলীকরণ করে আঙুল গুনতে বসলে আমরা আবিষ্কার করবো, অন্ততপক্ষে দেড়’শ জন বন্ধুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। শুনতে যতই অবিশ্বাস্য হোক, এটা খুবই সত্যি যে, এই বিশাল সংখ্যায় বন্ধুদের হাড়ির খবর, ঘরের খবর তার প্রতিনিয়ত জানা চাই; প্রতিনিয়ত ধারাবাহিকভাবে এই বিশাল বাহিনীর নানা অংশের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া চাই।

মাশরাফির বন্ধুদের সোজা কথায় চার ভাগে বিভক্ত করতে পারি আমরা: ১. নড়াইলের ছোটবেলার বন্ধুরা, ২. মিরপুরে তৈরী হওয়া কৈশোরের বন্ধুরা, ৩. ঢাকায় পা রাখা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ক্রিকেটে তৈরী হতে থাকা বন্ধুরা এবং ৪. বিভিন্ন কর্মসূত্রে তৈরী হওয়া সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি বন্ধুরা।

এই চার বন্ধু দলের বাইরেও বিভিন্ন পেশা ও জীবনের বিভিন্ন ধাপে অসংখ্য বন্ধু তৈরী করেছেন। সে বন্ধু তো সবারই তৈরী হয়। তবে মাশরাফির সঙ্গে বাকীদের একটা বড় পার্থক্য হলো-তার পুরো দুনিয়া এক দিকে, আর এই বন্ধুজগত আরেক দিকে। বন্ধুদের জন্য ক্যারিয়ার ও জীবনের হেন কোনো সংকট নেই, যা সামলাতে হয়নি তাকে।

শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুর জন্যই বন্ধুত্বের সঙ্গে আপোষ করেননি।

এর মধ্যে প্রথম তিন দলকে বলা চলে মাশরাফির জীবনের তিনটি অঙ্গ।

এদের কারো সঙ্গে তার কখনো বিচ্ছিন্নতা তৈরী হয়নি। কখনো মাসের পর মাস দেখা হয় না, কথা হয় না। কিন্তু এরপর প্রথম যেদিন দেখা হয়, তাদের পরষ্পরকে দেখে চিৎকার করে উঠতে হয় না। কারণ, তারা যেন এক জায়গাতেই ছিলেন।

সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হলো, ভিন্ন ভিন্ন শ্রেনীগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করা এই ভিন্ন ভিন্ন বন্ধুর দলের সঙ্গে তার যে অনবরত আড্ডা চলে, সে আড্ডায় মাশরাফিকে দেখে এদের থেকে আলাদা করাটা অসম্ভব।

নড়াইলের বন্ধুদের সঙ্গে মাশরাফি অনায়াসে এক পেয়ারা গাছ তলায় বসে ‘ডাসা পেয়ারা’ খেতে খেতে লুঙ্গিটা একটু গুটিয়ে গ্রাম্য একজন যুবক হয়ে উঠতে পারেন। অবশ্য ‘উঠতে পারেন’ বললে মনে হয়, এটা তিনি চেষ্টা করে করেন; আসলে ওই মুহুর্তে তাকে দেখলে এটাই আপনি বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, মাশরাফি এমনই।

তিনি নড়াইলের এই বন্ধুদের সঙ্গে এখনও রাত দুপুরে রাস্তায় বসে গান করার পরিকল্পনা করতে পারেন। পিকনিক করতে হলে কোন বাড়ির নারকেল চুরি করতে হবে, তা এখনও আবিষ্কার করেন। কিংবা এই বন্ধুদের সঙ্গে আদুল গায়ে এখনও তিনি চিত্রা নদীতে তুফান তুলতে পারেন।

আবার এই লোকটিই ক্রিকেটার বন্ধুদের সঙ্গে একেবারে ভিন্ন এক মেজাজে হাজির। এখানে মাশরাফিকে দেখলে বোঝা কঠিন, এই লোকটি জন্ম থেকে বুঝি পেশাদার ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচিত। যে লোকটি কিছুক্ষন আগেই নড়াইলে আদিরসাতক রসিকতা করে এসেছেন, তিনিই ক্রিকেটারদের আড্ডায় আবার কাটার আর সুইংয়ের পার্থক্য বোঝাচ্ছেন। আবার খানিক পরে ঝরঝরে ইংরেজীতে সাংবাদিকদের আড্ডায় এক পুরোনো স্কটিশ প্রবাদ শোনাচ্ছেন!

কোনো আড্ডায় বেমানান নন; সবচেয়ে বড় কথা কোনো বন্ধুর কাছে তিনি বড় নন।

এই ব্যাপারটা সবচেয়ে কৌতুহল জাগানোর মতো ব্যাপার। মাশরাফি বিন মুর্তজা অনেক বড় তারকা; বাংলাদেশের বিচারে মহাতারকা বটে। কিন্তু কোনোএকটি আড্ডায় এই মানুষটিকে তার আড্ডার বন্ধুদের চেয়ে এক ইঞ্চি এগিয়ে থাকা বলে মনে হবে না। নিজে বলেন-আমি পানির মতো; আর আড্ডা হলো আমার পানির পাত্র!

কখনো কোথাও একটু অভিনয় করা, একটু উপদেশ দেওয়া কিংবা একটা জ্ঞানের কথা বলে বন্ধুদের চেয়ে এগিয়ে থাকা কোনোমতেই নয়। চিত্রা নদীর পাড়ে বসে তিনি ঠিকই বন্ধুদের টেমস নদীর গল্প শোনাবেন। সেই শোনানোর মধ্যে তাদের চেয়ে বেশী কিছু দেখে ফেলেছেন, এমন ব্যাপারটা নেই। বরং মনে হবে, এদের এক প্রতিনিধি লন্ডনে গিয়েছিলো, যে নাকি এসে চোখ বড় বড় করে টেমস নদীর গল্প বলছে!

এই দেড়-দুই ’শ বন্ধু যে সার্বক্ষনিক মাশরাফির সঙ্গে ঘুরতে পারে না, সেটা বলে দিতে হবে না।

এর ভেতর থেকেই কেউ কেউ মাশরাফির সার্বক্ষনিক সঙ্গীও বটে। কেউ মাশরাফির চলার সঙ্গী, কেউ ঘোরার সঙ্গী, কেউ আবার সব ভরসার চূড়ান্ত ভরসা। পক্স হলে মাশরাফির মশারির মধ্যে পাওয়া যাবে এক বন্ধুকে, আইপিএল থেকে বিপুল টাকা এলে সেটা সামলাতে পাওয়া যাবে কোনো বন্ধুকে এবং ইনজুরিতে পড়ে ক্রাচের বদলে কাঁধে হাত দেওয়ার জন্য পাওয়া যাবে আরেক বন্ধুকে।

এক চলচ্চিত্রে কে যেন বলেছিলেন, ‘কোনোদিন যেন কাঁধের অভাব না হয়।’

মাশরাফির জীবনে হয়তো অর্থের অভাব হবে, বিত্তের অভাব হবে, খ্যাতিরও কোনো একদিন অভাব হয়ে উঠতে পারে; কাঁধের অভাব তার হবে না।

বন্ধুত্বের মতো সর্বগ্রাসী নেশা যে করতে পারে, তার হাতের নিচে কাঁধের অভাব হয় কী করে!

ঢাকা, মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এম এস এই লেখাটি ৫৯৪৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন