সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ৫ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নারী কথা (১ম পর্ব)

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০১৫

1489410830_1444246456.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
নারী যে সকল ইতিহাসবিদ বাংলার প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন তারা বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নারী-পুরুষের পার্থক্যকে বিবেচনায় আনেন নি। এ বিবরণসমূহে রানীদের এবং উপলক্ষবিশেষে রাজকীয় ভগিনীদের নাম পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু সর্বদাই পুরুষমানুষের সাথে যুক্ত হয়ে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কাহিনীতে দেখা যায় যে, পাল রাজা ধর্মপালের স্ত্রী রানী বল্লভদেবীকে বনবাসে পাঠানো হয়। কারণ, তিনি কোনো পুত্রসন্তান জন্ম দিতে পারেন নি। একটি রূপকথা অনুযায়ী বনবাসে থাকাকালীন তিনি সমুদ্র কর্তৃক নিষিক্ত হয়ে দেবপাল নামক একটি পুত্রকে গর্ভে ধারণ করেন। পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও ব্রাহ্মণদের প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রসারিত করেছেন।

বারো শতকে সেনগণ ক্ষমতায় আসার পর ব্রাহ্মণ পুরোহিতগণ ছিলেন রাজ দরবারের অপরিহার্য অঙ্গ। তাঁদের শাসনামলে ব্রাহ্মণদের নির্দেশাবলি কতটুকু পালন করা হতো তা জানা যায় না, তবে বলা যায় এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল তিনগুণ বয়সী বরের সাথে অপ্রাপ্তবয়স্ক কনের বিবাহ। পারিবারিক অনুষ্ঠানের অধিকাংশ ছিল নারীদের গর্ভধারণের সাথে সম্বন্ধযুক্ত: প্রথম রজঃস্রাব, গর্ভধারণ, সন্তানপ্রসব, মস্তকমুন্ডন, অন্নপ্রাশন এবং নামকরণ। কিছুসংখ্যক নারী, যাদের সকলেই ছিলেন নিঃসন্দেহে উচ্চশ্রেণীর, অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হলেও তাদের স্বেচ্ছায় চলাফেরার ক্ষমতা ছিল অতি সীমিত।

পরিবারে তাদের অবস্থান থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া নারীদের অন্য কোনো আইনগত অথবা সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারত না। এর ব্যতিক্রম ছিল বিধবাদের ক্ষেত্রে, অবশ্য কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে তাদের স্বামীদের সম্পত্তি ‘ভোগ’ করার অনুমতি দেওয়া হতো। এছাড়া তাদের নিজ ভরণপোষণের জন্য অতি অল্পসংখ্যক উপায় ছিল। রাজ অন্তঃপুরে নারীরা দৃষ্টির বাইরে নিভৃতে অবস্থান করলেও সাধারণভাবে নারীদের বেলায় এটা সত্যি ছিল না। কারণ তারা ঘোমটা দিয়ে চলত না। এটা বিশ্বাস করা হতো যে, বিধবারা অমঙ্গলসূচক এবং তাদের জন্য অনুষ্ঠানাদিতে উপস্থিত থাকা নিষিদ্ধ ছিল। পতিদের চিতায় তাদের আত্মাহুতি দিতে উৎসাহিত করা হতো। কিভাবে আধ্যাত্মিক কার্যাবলি সম্পন্ন করা হবে এবং কোন কাজটি আদর্শ আচরণ বলে পরিগণিত তা জানা যায় না। জনসাধারণ কিভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করত সে সম্পর্কে কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। অর্থনৈতিক উৎপাদনে নারীদের অংশগ্রহণ এবং তাদের জীবনে ফসল ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবর্তনের ফল কতটা ছিল সে সম্পর্কিত তথ্যও পাওয়া যায় না।

বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রথম তিন শতকে সমাজে হিন্দু জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল। সামাজিক ক্রমাধিকার বলবৎ করতে হিন্দু শাসনকর্তা না থাকলে জাতিপ্রথা কাউন্সিল প্রথার বিষয়ে মধ্যস্থতা করত। জাতিগত শুদ্ধতার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেওয়া হলে এর প্রভাব পড়ে নারীর ওপর, কারণ তারা ছিল আইন ও বিধির বাহক। শুদ্ধতা বজায় রাখতে বিবাহ ছিল প্রধান ভিত্তি এবং এ জন্য বিবাহ ও সন্তানদের পিতৃত্ব উভয়টিই সতর্কতার বিষয় ছিল।

বাংলা সাহিত্যে ‘স্বর্ণযুগ’ বলে বিবেচিত ষোল শতকে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে নারীরা আলোচিত হয়। বিষ্ণু পূজা বিভিন্ন আখ্যানের জন্ম দেয়। এ ক্ষেত্রে রামায়ণ ও কৃষ্ণের কাহিনী এবং রূপকাকারে মানবিক প্রেমসহ ভক্তিমূলক গানের কথা উল্লেখ করা যায়। এগুলোতে নারীদের নায়িকারূপে এবং কামনার লক্ষ্য ও বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্য প্রধান ঘরানা হলো মঙ্গলকাব্য যার কবিতাগুলো দেবীদের পূজাকে কেন্দ্র করে রচিত এবং স্থানীয় দেবীদের শিবের স্ত্রী ও এভাবে প্রভাবশালী ঐতিহ্যের সাথে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। শ্রী চৈতন্য পুরুষ ও নারী উভয়েরই উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করেন এবং কোনো কোনো ইতিহাসবিদ এটাকে এমন একটি সময় হিসেবে দেখেছেন যখন নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। ভদ্র পরিবারের নারীরা কীর্তন গানে অংশগ্রহণ করে, কিছুসংখ্যক নারী তীর্থযাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করে, এবং কিছুসংখ্যক নারী শিষ্য হিসেবে অন্যদের দীক্ষিত করে। মঙ্গলকাব্য ছিল জনপ্রিয় দেবীদের পূজা প্রচারের কাজে অতীব কার্যকর শক্তি। এ কাব্য কমলা, গঙ্গা, শীতলা, মনসা, ষষ্ঠী ও অন্যান্য দেবীকে জনসাধারণের মানসপটে প্রতিষ্ঠিত করে। এ যুগের অধ্যয়নে নিয়োজিত ইতিহাসবিদদের তথ্য আহরণের সমৃদ্ধ উৎস হলো মঙ্গলকাব্য এবং এটি নারীদের জীবন সম্পর্কেও কিছুটা আলোকপাত করে।

ষোল শতকের শেষ নাগাদ বাংলা মুগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দিল্লি থেকে এর শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। মুগল শাসনামলে উপমহাদেশে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ধান, তুলা ও রেশমের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বাংলা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ করে। ভূসম্পত্তি প্রদান ও অন্যান্য আকর্ষণীয় কার্যাবলি দ্বারা শক্তিশালী হিন্দু প্রধানদের মুগল শাসন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করা হয়। একই সময়ে চাষবাসের জন্য জমির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ইসলাম ধর্মের প্রতি জনগণের আনুগত্য বেড়ে যায়।

একালের নারীদের সম্পর্কে যা জানা যায় তা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। হিন্দু নারীদের মধ্যে যারা শিব-শক্তির পূজা করত তারা কালী ও দুর্গা পূজা প্রবর্তনের সাথে সাথে এসব অনুষ্ঠানাদিতে অধিক বেশি জড়িত হয়ে পড়ে। কিন্তু দেবী পূজা নারীদের জন্য কি গুরুত্ব ও অর্থ বহন করে তা বিশ্লেষণ করা কষ্টকর। কোনো কোনো পন্ডিত মনে করেন যে, দেবী পূজার মাধ্যমে নারীরা ক্ষমতা অর্জন করে কারণ তারা দেবীর ক্ষমতার সাথে নিজেদের একাত্ম বোধ করে; আবার কেউ কেউ মনে করেন, দেবীগণ প্রধানত পুরুষ ভক্তদের উপকার করেন। অধিকন্তু, নারীদের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে কালী ও শীতলার মতো দেবীদের বিপজ্জনক ও অযৌক্তিক দিককে যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

নারীদের ক্ষমতায়নের পরিভাষার ন্যায় বৈষ্ণব ধর্মবিশ্বাসও অনুরূপভাবে দ্ব্যর্থক। সকল রকম বিষ্ণু পূজাপদ্ধতি নারীদের আধ্যাত্মিক সমতাকে স্বীকৃতি জানিয়ে তাদের পরিচিতি দান করে, কিন্তু চৈতন্য তাঁর ভক্তদের নারীদের প্রতি তাকাতে অথবা তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। ধর্ম ভক্তির ক্ষেত্রে নারীদের সুপ্ত শক্তির ওপর গুরুত্বারোপ মনে হয়। তাদের যৌনতার বিষয় গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ভীতি ও সন্দেহের সাথে সম্বন্ধযুক্ত ছিল।

এ উৎসগুলো একমত পোষণ করে যে, হিন্দু ও মুসলমানরা বিভিন্ন প্রথা অনুসরণ করত কিন্তু যে সকল ক্ষেত্রে মুসলমানগণ হিন্দু প্রথা পালন করত এবং হিন্দুরা মুসলমানদের প্রথা অবলম্বন করেছিল সেগুলোর উপরও লক্ষ্য রাখত। মুসলিম শাসকশ্রেণী এদেশে আসার সময় কদাচিৎ নারীদের সহযাত্রী করেছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে তাদের স্ত্রীগণ, এবং অবশ্যই দাসীরা, বাংলা থেকে সংগৃহীত হয়েছিল। দাসীরা গৃহস্থালির কার্যে নিয়োজিত হতো, কিন্তু তারা কোথা থেকে আসত অথবা তারা পরিবারে কি ভূমিকা পালন করত সে সম্পর্কে জানা দুঃসাধ্য।

ঐতিহাসিক বিবরণ হিন্দু নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণের কাহিনীতে ভরপুর হলেও এগুলোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখ না করে শুধু সাধারণ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এতদ্সত্ত্বেও বাল্যবিবাহের মতো প্রথাকে অনুসরণ করার ক্রমবর্ধমান কঠোরতাকে নারীদের প্রতি সহিংসতার একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল।

যদিও কিছুসংখ্যক হিন্দু মেয়ে পাঠশালায় যেত এবং শিক্ষিত নারীরা তাদের পান্ডিত্যের জন্য সুপরিচিত ছিল, তবু নারীদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল বিরল। মেয়েরা শিক্ষাগ্রহণ করলে তা তাদের অকাল বৈধব্য ডেকে আনবে, এরূপ বিশ্বাস বোধ হয় ছিল বহুবিস্তৃত। এর সাথে বাল্যবিবাহের প্রতি ঝোঁক ও স্ত্রীজাতির সতীত্বের ব্যাপারে উদ্বেগের ফলে দেখা যায়, যে সকল মহিলা পড়তে শিখেছে তারা সেটা স্কুলে গিয়ে নয় বরং অন্তঃপুরে শিখেছে। বাল্যবিবাহের ব্যাপকতায় দেখা যায়, হিন্দুদের অনেক বালবিধবাকে পরিধেয় বস্ত্র ও খাবার-দাবারের ব্যাপারে কঠোর নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হতো। হিন্দু নারীরা কখন প্রথম পর্দা প্রথা পালন শুরু করে তা অজ্ঞাত। মনে হয়, এ প্রথা ষোল ও আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছিল এবং তা অপহরণের ভয় ও সতীত্বের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপের কারণে। বাল্যবিবাহ, পুনর্বিবাহ ছাড়া আবশ্যিকভাবে বৈধব্যপালন এবং নারীদের চলাচলের উপর বিধিনিষেধ আরোপ ইত্যাদি প্রথা ছিল হিন্দু উচ্চবর্ণের বৈশিষ্ট্য, নিম্নবর্ণের লোকদের জন্য এগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য ছিল না। এ উৎসসমূহ থেকে মুসলিম নারীদের বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু পুরুষদের বহুবিবাহ ও নারীদের নিভৃতে থাকার ন্যায় প্রথার প্রচলন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তাদের শিক্ষাদীক্ষা অথবা বিবাহের স্বাভাবিক বয়স সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়।

ব্রিটিশ শাসন জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। উনিশ শতকের প্রারম্ভে ‘নারী’ প্রশ্নটি ভারতীয় সভ্যতা সম্পর্কে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে এবং প্রভাবশালী ব্রিটিশ লেখকগণ ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজকে নিকৃষ্ট বলে নিন্দা করে নারীদের প্রতি যে আচরণ করা হয় সে বিষয়টি উল্লেখ করেন।

হিন্দু ও মুসলিম এ দুটি প্রধান সম্প্রদায় প্রভাবিত হয়েছিল ভিন্নভাবে। মুসলমানগণ ও অনেক হিন্দু আত্মরক্ষার্থে নিজেদের অবস্থানে গুটিয়ে নিলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ কেউ তাদের নিজেদের সমাজকে পর্যালোচনা করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং সংস্কারের প্রস্তাব করেন। তখন থেকেই নারী সম্বন্ধীয় আলোচনায় সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বৈধব্য, বহুবিবাহ এবং শিক্ষার ব্যাপারে বাধানিষেধ আরোপের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

বিদেশি লেখক যারা এদেশীয় সংস্কৃতিকে ‘বর্বরসুলভ’ বলে ঘোষণা করেন তাদের ব্যাপারে সংস্কারকগণ মতামত ব্যক্ত করেন। কিন্তু তাঁরাও ছিলেন পাশ্চাত্যের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত এবং ভারতীয় ঐতিহ্যসমূহ যে যুক্তিযুক্ত ও মহীয়ান সেটা প্রমাণের ব্যাপারেও উদ্বিগ্ন। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করেন এবং যুক্তি দেন যে নারীদের ‘পশ্চাৎপদতা’ ছিল সামাজিকীকরণের ফলাফল। পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবাদের মর্যাদাকে উন্নতকরণ এবং পুনর্বিবাহকে উৎসাহদান, নারীশিক্ষাকে সমর্থন ও পুরুষের বহুবিবাহ নিরোধ করতে তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেন। ১৮২৯ সালে ব্রিটিশরা সতীদাহকে বেআইনী ঘোষণা করে এবং ১৮৫৬ সালে বিধবাদের পুনর্বিবাহ আইন পাস করে। তবে সতীদাহ চলতে থাকে। নারীদের জীবনে ১৮৫৬ সালের আইনের প্রভাবও ছিল যৎসামান্য। ব্রিটিশরা ছিল বিদেশি প্রভু এবং সামাজিক প্রথাসমূহ সম্বন্ধে তাদের ঘোষণাবলি সমাজে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনয়নে মোটেই যথেষ্ট ছিল না।

সংস্কারকদের মধ্যে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল নারীশিক্ষা। বাংলায় শিক্ষার অবস্থার উপর একটি রিপোর্টে (১৮৩৬) উইলিয়ম অ্যাডাম লেখেন, যখন হিন্দুরা বিশ্বাস করত যে শিক্ষা বালবিধবার পথ প্রশস্ত করবে, তখন হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই নারীদের শিক্ষিত করার ব্যাপারে অনীহা ছিল, কারণ তারা এর মধ্যে ‘নারসিুলভ ষড়যন্ত্রের’ আশঙ্কা করে। ঐ সময় নারীশিক্ষা ছিল প্রধানত অনানুষ্ঠানিক এবং ব্যবহারিক বিষয়াবলির মধ্যে সীমিত। সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীরা প্রায়শ ‘নির্মল বিনোদন’ হিসেবে ধ্রুপদী অথবা দেশিয় সাহিত্য পাঠ করত, এবং ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েরা হিসাবরক্ষণের কাজে লাগে এমন কিছু শিক্ষাগ্রহণ করত। এখানে স্মর্তব্য যে, বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম আত্মজীবনী আমার জীবন (১৮৭৫ সালে প্রকাশিত)- এর লেখক ছিলেন একজন গৃহবধূু রাসসুন্দরী দেবী যিনি নিজের চেষ্টায় পড়তে শিখেন। মুসলমান মেয়েদের নিকট থেকে প্রত্যাশিত ছিল যে, তারা কুরআন পড়তে শিখবে ও হিসাবনিকাশে কিছুটা দক্ষতা অর্জন করবে। শিক্ষিত ও হিসাবনিকাশ সামলানোর ব্যাপারে যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের সংখ্যা ইংরেজদের দেওয়া হিসেবের চেয়ে নিঃসন্দেহে অধিক বেশি থাকলেও তাদের মোটামুটি সংখ্যা কত ছিল সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া দুঃসাধ্য।

বাংলায় মেয়েদের স্কুল প্রথম চালু করেন মিশনারিগণ। ১৮১৯ সালে ব্যাপ্টিস্ট মিশন ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ গঠন করে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ‘সম্ভ্রান্ত’ হিন্দু বালিকাদের জন্য চার্চ মিশনারি সোসাইটি কর্তৃক যে ৩০-টিরও অধিক স্কুল খোলা হয় তার দায়িত্ব নিতে ১৮২১ সালে মিস মেরী অ্যান কুক কলকাতায় আগমন করেন। ১৮২৪ সাল নাগাদ ঢাকায় একটি খ্রিস্টান মহিলা স্কুল শুরু করা হয়, কিন্তু ১৮২৬ সালে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এ স্কুলগুলোতে ব্রাহ্মণ পন্ডিতগণ শিক্ষাদান করতেন, হিন্দু সদ্বংশজাত ব্যক্তিগণ এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এগুলো উচ্চতর বর্ণ থেকে মেয়েদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়।

মেয়েদের বিখ্যাত স্কুলগুলোর অন্যতম বিদ্যালয় ছিল ১৮৪৯ সালে কলকাতায় জে.ই ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়। বেথুন তাঁর এ পদক্ষেপের পক্ষে বিখ্যাত কয়েকটি পরিবারের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন। ফলে ১৮৫০ সাল নাগাদ এর ছাত্রীসংখ্যা দাঁড়ায় ৮০ জন। ১৮৫৪ সালে সরকার অনুদানের মাধ্যমে নারীশিক্ষাকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করে। ঐ বছর মেয়েদের জন্য বাংলায় সর্বমোট ২৮৮টি স্কুল ছিল। যারা নারীশিক্ষাকে সমর্থন করত তারা চাইত যে তাদের কন্যাগণ তাদের নিজ নিজ পতির উপযুক্ত সঙ্গিনী, ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ ও সুশীল সমাজের সদস্য হবে।

ব্রাহ্মসমাজ নারীশিক্ষার প্রসার ও লৈঙ্গিক সমতার জন্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। উনিশ শতকের শুরুতে যারা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পর্যালোচনা করে দেখতে চাচ্ছিলেন তাঁদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সমাজ উনিশ শতকের ষাটের দশক নাগাদ জনসমাবেশ, ধর্মীয় শিক্ষা ও নারীদের জন্য সেলাই শিক্ষার আয়োজন করে। এক দশকের মধ্যে সমাজ-এর সদস্যবৃন্দের মাঝে নারীশিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের প্রশ্নে মতবিরোধ দেখা দেয়। ১৮৭৮ সালে ‘নারী-মুক্তি’-র প্রশ্নে এটি বিভক্ত হয়ে যায় এবং সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ-এর প্রগতিশীল শাখাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৮৩ সালে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী (১৮৬১-১৯২৩) ও চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রথম মহিলা স্নাতক হন।

উনিশ শতকের শেষদিকে শুধু মুসলমান সম্প্রদায় নারীশিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক বিষয়সমুহের প্রতি মনোনিবেশ করে। প্রথম যারা এ সংস্কারে মনোনিবেশ করেন তারা ছিলেন বুদ্ধিজীবী আশরাফ শ্রেণির সদস্য। তাদের সাথে যোগ দেন আলীগড়ে সৈয়দ আহমদ খানের কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত প্রচুর ভূসম্পত্তির অধিকারী পরিবারসমূহ এবং একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা ব্যবসায় ও প্রশাসনিক কাজের মাধ্যমে সম্পদ ও মর্যাদা লাভ করে। উত্তর ভারতের উর্দু সাহিত্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে বাংলার মুসলমানগণ তাদের কন্যাদের আদর্শ নারীসুলভ আচার-ব্যবহার সম্পর্কিত গ্রন্থাবলি পাঠের নির্দেশ দেয়। এ ধরনের গ্রন্থাবলির অন্যতম ছিল উর্দু ভাষায় লিখিত আশরাফ আলী থানবীর বেহেশতী জেওর (১৯০৫)। ১৯২৫ সালে এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটি রচনার উদ্দেশ্য ছিল ‘নব চিন্তাধারার অধিকারী মুসলমান নারী’-কে পথনির্দেশ দেওয়া যাতে তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বকে বুঝতে, ঐতিহ্যকে নিষ্ঠার সঙ্গে লালন ও রক্ষা করতে, স্বেচ্ছায় পরনির্ভরতা ও পারিবারিক গন্ডির মধ্যে তার মর্যাদাকে স্বীকার করে নিতে পারে। নারীদের জন্য পুরুষ কর্তৃক প্রণীত এ গ্রন্থসমূহে শিক্ষার কথা বলা হয়েছে যার উদ্দেশ্য ছিল নারীর জন্য পরিবারে সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // অা হ এই লেখাটি ১৪৭৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন