সর্বশেষ
মঙ্গলবার ১০ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নারী কথা (২য় পর্ব)

শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০১৫

267689543_1444485031.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
হিন্দু সংস্কারকদের নিকট প্রাধান্য পেয়েছে এরূপ কিছু বিষয় নিয়েও মুসলিম সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন ছিল। এগুলোর একটি হলো বাল্যবিবাহ। এ বিষয়ের ওপর মুসলমান সংস্কারকগণ উনিশ শতকের শেষদিকে ও বিশ শতকের শুরুতে মতামত ব্যক্ত করেন। কিন্তু তারা এমন কিছু বিষয়ের ওপরও আলোকপাত করেন যেগুলো তাদের নিকট ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যেমন দেনমোহর, কাবিন, উত্তরাধিকার, বহুবিবাহ, ও নারীদের পর্দা। ক্রমান্বয়ে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা এ সংস্কারসমূহ সমর্থন করে তারা এমন এক জীবনযাত্রার বিকাশ ঘটায় যা সংস্কারবাদী হিন্দুদের নির্দেশিত ব্যবস্থার মতো ছিল না।

সম্ভ্রান্ত এক ভূস্বামীর মালিকের কন্যা নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ১৮৭৩ সালে কুমিল্লায় প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিশ শতকের পূর্বে এ ধরনের বিদ্যালয়ে মুসলমান মেয়েরা যোগদান করে নি। ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী কিছুসংখ্যক মুসলিম ব্যক্তি উনিশ শতকের আশির দশকে ‘মুসলমান সুহূদ সম্মিলনী’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠন মেয়েদের জন্য নিয়মানুগ গৃহশিক্ষার অনুকূলে মত প্রকাশ করে এবং এ আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি পাঠক্রম প্রস্ত্তত, পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ এবং পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করে। মুসলমান বালিকাদের শিক্ষাগ্রহণের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যিনি শুরু করেন তিনি হলেন রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)। ভূস্বামী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রোকেয়া তাঁর ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে গোপনে লেখাপড়া শিখেন। তাঁর স্বামী তাঁর শিক্ষার এ ধারাটি অব্যাহত রাখেন, অন্যান্য সম্প্রদায়ের ‘নতুন আলোকপ্রাপ্ত নারীদের’ সাথে তাঁর মেলামেশাকে উৎসাহিত করেন, এবং মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে তাঁকে প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য করেন। ১৯১১ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল ছিল বাংলায় মুসলমান মহিলাদের জন্য প্রথম বিদ্যালয়।

পর্দা ও অবগুণ্ঠনের ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কেও রোকেয়া অবগত ছিলেন এবং এগুলো সম্পর্কে তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় আলোচনা করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯২৯ সালে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ভীতিকর ও কৌতুকপূর্ণ রচনাসংকলন অবরোধবাসিনী। অবগুণ্ঠনের বাড়াবাড়িকে তিনি যতই অপছন্দ করুন না কেন, রোকেয়া তাঁর স্কুলে এর নিয়মকানুন পালন করতেন।

বিশ শতকের শুরু নাগাদ সামাজিক সংস্কারকে এগিয়ে নিতে বাংলার নারীরা তাদের নিজস্ব সংগঠন তৈরি করতে থাকে। ঠাকুর পরিবারের একজন সদস্য সরলাদেবী চৌধুরানী (১৮৭২-১৯৪৫) ভারতীয় নারীদের জন্য একটি স্থায়ী সঙ্ঘের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ভারত স্ত্রী মহামন্ডল নামক তাঁর সংগঠন ১৯১০ সালে এলাহাবাদে প্রথম সভায় মিলিত হয়। সংগঠনটি শীঘ্রই বাঁকুড়া, হাজারিবাগ, মেদিনীপুর ও কলকাতাসহ ভারতের অন্যান্য নগরীতে এর শাখা গড়ে তোলে। এ সংগঠনটির উদ্বেগের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল নারীশিক্ষা এবং যেসব শিক্ষক নারীদের তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়তে, লিখতে, সংগীত, সেলাই ও এমব্রয়ডারি শিক্ষা দিত তাদেরকে এ সংগঠন আর্থিক সহায়তা দিত। সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত মুসলিম নারীদের মাঝে কাজ করার জন্য ১৯১৬ সালে রোকেয়া আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতিন-ই-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময় বাংলায় নারীদের ইনস্টিটিউট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সরোজ নলিনী দত্ত (১৮৮৭-১৯২৫) জেলা শহরগুলোতে মহিলা সমিতি সংগঠিত করেন।

বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে সর্বভারতীয় নারী সংগঠনগুলো আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে যেখানে বাংলার নারীরাও যোগদান করে। দি ন্যাশনাল কাউন্সিল অব উইমেন ইন ইন্ডিয়া এবং অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স দুটি সংগঠনেরই বাংলায় শাখা ছিল এবং বাংলার নারীরা সেগুলোর জাতীয় কাউন্সিল ও কমিটিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বাংলার নারীরা জড়িত হয় উনিশ শতকের শেষদিকে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হওয়ার পাঁচ বছর পর ১৮৯০ সালে ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারী ঘোষাল (১৮৫৬-১৯৩২) ও ভারতের অন্যতম প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী প্রতিনিধি হিসেবে এর অধিবেশনে যোগ দেন।

১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে। বিদেশি পণ্য বর্জন ও শুধু দেশিয় দ্রব্য ক্রয়ের মাধ্যমে এ বিভক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে যোগ দেয়। অন্য নারীরা স্বদেশের কাজে নিজেদের উৎসর্গ করার ব্রত নেয় এবং এ কাজের জন্য প্রতিদিন এক মুষ্ঠি চাল জমা রাখার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর বাইরেও নারীরা বিপ্লবী সংগঠনগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন জ্ঞাপন করে।

১৯১৭ সালে ভারত সচিব এডউইন মন্টেগু যখন অধিক সংখ্যক ভারতীয়কে শাসনকার্যে অন্তর্ভুক্ত করা সম্পর্কিত ব্রিটিশ সরকারের অভিপ্রায়ের কথা ঘোষণা করেন, তখন নারীদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আলোচনার জন্য ভারত স্ত্রী মহামন্ডলের সদস্যদের পক্ষ থেকে সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের  আবেদন জানান। মাদ্রাজে নবগঠিত ভারতীয় নারী এসোসিয়েশনের সদস্যবৃন্দও তাঁর কাছে সাক্ষাৎদানের অনুরোধ করেন। সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ উভয় দলকে জানান যে, শুধু রাজনৈতিক বিষয়াবলির ওপর প্রতিনিধিবর্গের বক্তব্য শোনা হবে। ডিসেম্বর মাসে মন্টেগু ও চেমসফোর্ডের সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং মহিলাদের জন্য ভোটের অনুরোধ জানাতে হায়দ্রাবাদ থেকে সরোজিনী নাইডু সর্বভারতীয় বিশিষ্ট নারীদের একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এতে সরলাদেবী চৌধুরাণী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সরোজিনী নাইডু ও সরলাদেবী চৌধুরানী মহিলাদের ভোটদানের অধিকারের পক্ষে কংগ্রেসের সমর্থন পান। ইংল্যান্ডে সরোজিনী নাইডু জয়েন্ট সিলেক্ট কমিটির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন যে, সকল ভারতীয় নারী, এমনকি গোঁড়া হিন্দু ও মুসলমান নারীরাও ভোটের অধিকার চায়। অবশেষে হাউস অব কমন্স প্রাদেশিক বিধান পরিষদসমূহকে রেজিস্ট্রিকৃত ভোটারদের তালিকায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি প্রদান করে। নারী সংগঠনগুলো ভোটদানে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে থাকে এবং ১৯২৬ সালে বাংলায় সম্পত্তির অধিকারী এমন মহিলারা ভোটাধিকার লাভ করে। মহিলা আসন ছিল সমগ্র নির্বাচকমন্ডলীর শতকরা ৩ ভাগ।

বাংলা ও ভারতব্যাপী নারীদের বিক্ষুব্ধ রাজনীতিতে নিয়ে আসতে গান্ধী প্রাথমিক ভূমিকা পালন করেন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে কংগ্রেস নেতা সি.আর দাশের পরিবারের সদস্য বাসন্তী দেবী, ঊর্মিলা দেবী ও সুনীতি দেবী ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের সমর্থনে বিক্ষোভ জানাতে রাস্তায় নেমে আসেন। তাঁদেরকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের আটক করা হলে তা জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং গান্ধী সমগ্র ভারতের নারীদের বাংলার এ সাহসী নারীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণের আহবান জানান।

লতিকা ঘোষ (জন্ম ১৯০২) কর্তৃক ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মহিলা রাষ্ট্রীয় সঙ্ঘ ছিল বাংলার নারীদের রাজনীতিতে সংগঠিত করার প্রথম নিয়মমাফিক সংগঠন। ঐ বছর কলকাতায় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে শোভাযাত্রায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মার্চ করে যাবার জন্য নারী স্বেচ্ছাসেবকদের একটি দল গঠনের জন্য সুভাষচন্দ্র বসু লতিকাকে অনুরোধ করেন। লতিকা বেথুন কলেজ ও ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনের ছাত্রী এবং কলকাতা কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়োগকৃত শিক্ষিকাদের সমন্বয়ে ৩০০ নারীর একটি দল গঠন করেন। পরের বছর (১৯২৯) জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য নারীদের প্রস্ত্তত থাকতে কংগ্রেসের আহবানে  কলকাতার নারীরা নারী সত্যাগ্রহ সমিতি গঠন করে। আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালে নারীরা লবণ তৈরি ও বিক্রয় করে, বস্ত্র ও মদের দোকানে পিকেটিং চালায়, খদ্দরের উপযোগিতা সম্পর্কে প্রচার করে এবং শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।

ঐ সময় মুসলমানগণ সাধারণত কংগ্রেসের ব্যাপারে বেশ সংশয়যুক্ত ছিল। আইন অমান্য আন্দোলনের প্রাক্কালে গাড়োয়ানদের ধর্মঘটের সমর্থনে কলকাতার হিন্দু ও মুসলমান একত্রিত হয়। ধর্মঘটের প্রথম দিনে সাতজন গাড়োয়ানকে হত্যা করা হয় এবং পরদিন যখন হিন্দু ও মুসলমান একসাথে শোক পালন করে; নারীরা বাড়ি থেকে ফুল ছুড়ে দিয়ে তাদের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। কিন্তু অচিরেই তাদের এই সংহতিতে ভাঙন ধরে এবং অনেকগুলো শহরে সহসাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় বিপ্লবী সংগঠনগুলো তাদের হয়ে কাজ করার জন্য বেশিরভাগ ছাত্রীসহ নারীদের রিক্রুট করতে থাকে। চারজন বিপ্লবী নারীর কৃতিত্বের কথা ইতিহাসবিদগণ কর্তৃক যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর কুমিল্লার দুজন স্কুলছাত্রী শান্তি ঘোষ (১৯১৬-১৯৮৯) ও সুনীতি চৌধুরী (১৯১৭-১৯৮৮) ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্কে গুলি করে হত্যা করে। পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বীণা দাস (১৯১১-১৯৮৬) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলার গভর্নরকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায়। সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামের স্কুল শিক্ষিকা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-১৯৩২) চট্টগ্রাম ক্লাবে হামলায় পনেরো জনের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হামলা চালানোর পর গ্রেফতার এড়াতে ক্লাব থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে প্রীতিলতা বিষ পান করে প্রাণ বিসর্জন দেন। এদের মধ্যে প্রথমোক্ত তিন জনকে দীর্ঘ মেয়াদি কারাদন্ড দেওয়া হয়।

জেলা শহর ও গ্রামগুলোতে নারীরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে, খদ্দর পরিধান করে, এবং আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের লুকিয়ে রাখে। মেদিনীপুর, চবিবশ পরগনা, খুলনা, বাখেরগঞ্জ, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের নারীরা লবণ আইন ভঙ্গ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত পুলিশের নৃশংস নির্যাতন মোকাবেলা করে। এই বিশৃংখল পারিপার্শ্বিক অবস্থাতেই সরলাদেবী চৌধুরানী নারীদের জন্য আলাদা কংগ্রেস সংগঠিত করার চেষ্টা চালান। এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য সমগ্র বাংলা থেকে নারীরা ১৯৩১ সালের মে মাসে একত্রে মিলিত হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথেই থেকে যায়।

১৯৩২ সাল নাগাদ শহরগুলোতে সরকার বিরোধিতা কমে আসে, কিন্তু গ্রামাঞ্চল ও নারীদের মধ্যে তা বৃদ্ধি পায়। মুসলমান তাঁতিরা এবং দেওবন্দ মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণকারী বহু লোক এ সময় এই আন্দোলনে যোগ দেয়। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ও পুনা চুক্তি বিতর্কিত বিষয়টির প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনে। কারণ ইতোমধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমন্ডলী এবং হিন্দু নিম্নবংশজাতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকবে। হিন্দুদের নির্বাচনসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হিন্দু মহাসভা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে এবং হিন্দু নারীদের উপর মুসলমানদের দৈহিক নির্যাতন সম্পর্কিত কল্পিত কাহিনী প্রচার করে।

শুধু বিশ শতকে এসে নারীদের কাজের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। একদিকে অনেক কারখানা গড়ে ওঠায় নারীদের কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হয়, অন্যদিকে আগে নারীদের অর্থ উপার্জনের যে পথ খোলা ছিল যান্ত্রিকীকরণের ফলে তা অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলার পাটকলগুলোতে শ্রমিকদের প্রায় শতকরা ২০ ভাগ ছিল নারী। কিন্তু তাদের অনেকেই বাঙালি ছিল না। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান নারীরা পর্দার বিধিনিষেধ দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতো এবং তারা ছিল নারী পাট কর্মীদের মাত্র শতকরা ১০ ভাগ। বর্ধিতাকারে যান্ত্রিকীকরণ ও শ্রমিক আইন চাপিয়ে দেওয়ার ফলে জুট মিলগুলোতে নারীদের নিয়োগ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি ১৯৩০ সাল থেকে পরিদৃষ্ট হতে থাকে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও ধর্মঘট ও শ্রমিক বিক্ষোভের সময় এবং ধর্মঘট ভঙ্গকারী ও শ্রমিক নেত্রী হিসেবে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্য নারীরা ঝি, কুলি ও গনিকা হিসেবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ নিয়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে।

উনিশ শতকের শেষদিকে শিক্ষিত নারীরা শিক্ষকতা ও চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত হওয়ার জন্য ট্রেনিং নেয়। ১৮৮৪ সালে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রথম নারী হিসেবে ভর্তি হন। বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মেরী মিত্র প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে ১৮৮৯ সালে মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। মাতৃভাষায় মেডিক্যাল ডিগ্রি প্রদানকারী ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল ১৮৮৮ সালে নারীদের জন্য এর দ্বার উন্মুক্ত করে। বাংলার প্রথম মুসলমান নারী হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নে মুসাম্মৎ ঈদেন্নেসা ১৮৯১ সালে এ প্রোগ্রামে ভর্তি হন। তিনি ১৮৯৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে ময়মনসিংহে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলনে নারীরা বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করে। এ আন্দোলন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়লে কৃষক পরিবারের বিরাট সংখ্যক নারী খাজনা, জমির ভোগদখলের সময়কাল ও ভূমিমালিকের অধিকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে পুরুষদের সাথে যোগ দেয়। ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে মেদিনীপুর জেলার চারটি মহকুমায় চাষীরা থানা আক্রমণ করে ও টেলিগ্রাফ লাইন বিনষ্ট করে। তমলুক মহকুমার জনগণ মার্চ করে শহরের দিকে যাওয়ার সময় ৭৩ বছর বয়সী একজন বিধবা মাতঙ্গিনী হাজরা সম্মুখে এগিয়ে আসেন, কংগ্রেসের ঝান্ডা তুলে ধরেন এবং জনসমক্ষে তাঁর প্রথম ভাষণ দান করেন। তিনি যে হাতে ঝান্ডা ধরে রেখেছিলেন প্রথমে সে হাতে এবং পরে তাঁর মাথায় গুলি করা হয়।

এ আন্দোলনে অরুণা গাঙ্গুলী আসফ আলী (১৯০৯-১৯৯৬) ও সুচেতা মজুমদার কৃপালনী (১৯০৮-১৯৭৪) নামে দুজন বাঙালি মহিলা সর্বভারতীয় নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে ব্যাহত ও এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ১৯৪২ সালে অরুণা আসফ আলী আত্মগোপন করেন। সুচেতা কৃপালনীও ১৯৪২ সালে আত্মগোপন করেন, কিন্তু সরকারকে অচল করে দিতে অহিংস কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য তিনি কাজ চালিয়ে যান।

বাংলায় ১৯৪৩-১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষে কমপক্ষে ৩৫ লক্ষ লোক মারা যায় এবং এর চেয়েও অধিকসংখ্যক ব্যক্তিকে দারিদ্র্যবরণ করতে ও গৃহচ্যুত হতে হয়। যে সকল নারী পূর্বে ঢেঁকিতে ধান ভেনে অথবা স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা করে জীবিকা নির্বাহ করত তারা উপার্জনের পথ থেকে বঞ্চিত হয়। খাদ্য ঘাটতির পাশাপাশি নারীরা যখন কাজের অন্বেষণে বের হয় অথবা সাহায্যের আশায় রিলিফ কেন্দ্রগুলোতে ভীড় জমায় তখন তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে নারীরা পরিস্থিতির শিকার হয়। ভুখা নারীরা প্রকাশ্য স্থানে খাদ্য ভিক্ষা করে, আর মধ্যবিত্ত-শ্রেণীর নারীরা রিলিফ প্রদানের কাজে সম্পৃক্ত হয়।

জার্মানি ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও ভারত এ যুদ্ধে সম্মতি প্রদান করে নি। সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে পালিয়ে যান এবং ১৯৪৩ সাল নাগাদ সিংগাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে ব্যাপৃত থাকেন। প্রথাগত সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত বাহিনী হিসেবে তিনি ঝাঁসির রানী ব্রিগেড নামে নারীদের একটি ইউনিট সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন। অনতিবিলম্বে তিনি কিছুসংখ্যক বাঙালি নারীসহ ১০০০ নারীকে রিক্রুট করেন, যারা মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে আমরণ যুদ্ধ করতে প্রস্ত্তত ছিল।

১৯৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলনে নারীরা ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে কমিউনিস্টদের মধ্যে ছিলেন রানি মিত্র দাশগুপ্ত, মণিকুন্তলা সেন ও রেনু চক্রবর্তী (১৯১৭-১৯৯৪)। গ্রামের নারীরা প্রথমে সাহায্যকারীর ভূমিকায় এবং পরে নেত্রী ও যোদ্ধা হিসেবে নির্দ্বিধায় এ আন্দোলনে যোগ দেয়। এ ধরনের নারীদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিতদের একজন হলেন মেদিনীপুর জেলার বিমলা মাঝি নামে একজন বিধবা যিনি নারীদের একজন সফল সংগঠকে পরিণত হন।

১৯৪৬ সালের আগস্ট মাস উপদলীয় রাজনীতিতে একটি নতুন পর্বের সূচনা করে। প্রতিবেশী হিন্দু ও মুসলমানরা পাশাপাশি বসবাস করলেও এ সময় তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে তৎপর হয়। কলকাতার দাঙ্গার পরে নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ত্রিপুরায় দাঙ্গা সংঘটিত হয়।

১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বাঙালি নারীদের বিবরণ দিতে গেলে নারীরা তাদের নতুন জাতীয় পরিচয়ে যেভাবে গড়ে উঠেছে তাতে নারী হিসেবে তারা কি করতে পারত এবং কি করতে পেরেছে এ উভয় চিত্র তুলে ধরতে হবে। 

সূত্র: বাংলাপিডিয়া

ঢাকা, শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // অা হ এই লেখাটি ১৫০২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন