সর্বশেষ
মঙ্গলবার ১০ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

নারী কথা ( ৩য় পর্ব )

রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০১৫

54332603_1444581637.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বাংলাদেশের নারী জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসর থাকায় বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের অবস্থার উন্নতিকল্পে বিশেষ সুবিধা ও অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রণীত প্রথম ও মূল সংবিধান এবং পরবর্তীতে কয়েকটি সংশোধনীতে তাদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা ও সংরক্ষিত অধিকার দেওয়ার কথা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংযোজন করা হয়েছে।

সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণনা করা হয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি। এ অধ্যায়ের ১৫নং ধারার (ঘ) উপধারায় ঘোষিত হয়েছে যে, সমাজের দুঃস্থ মানুষের পাশাপাশি বিধবাদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। ১৭নং ধারার (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক এবং বালিকার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ১৮ (২) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র কর্তৃক পতিতা বৃত্তি বন্ধ করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ১৯নং ধারার ১নং উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিবে এবং ২নং উপধারায় লিখিত হয়েছে, রাষ্ট্র মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মৌলিক অধিকার সম্বলিত ধারাসমূহ। ২৭নং ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮নং ধারার ১নং উপধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশ বা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা বা শর্তের সম্মুখীন হতে হবে না এবং একই ধারার ৪নং উপধারা অনুযায়ী যেকোন অনগ্রসর এলাকার নারী বা শিশু অথবা নাগরিকদের উন্নতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। ২৯নং ধারার ১নং উপধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কর্মে নিয়োগ লাভের ব্যাপারে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে এবং একই ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের কর্মে নিয়োগ বা কর্ম লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না অথবা তাঁর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা ৩০০। এর অতিরিক্ত মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৪৫টি আসন। তবে সাধারণ আসনের নির্বাচনে মহিলাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কোনো বাধা নেই। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধান জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য ৬৫নং ধারার মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেছে। ১৯৭৩-এ সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ছিল ১৫টি এবং এ আসনগুলি দশ বছরের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। ১৯৭৯ সালে নারী দশকের প্রভাবে এ আসন সংখ্যা ৩০-এ বাড়ানো হয়। নিয়মানুযায়ী ১৯৮৮ সালের সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না। দশম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯১ সালে পুনরায় দশ বছরের জন্য ৩০টি আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ২০০৪ সালে এ সংখ্যা ৪৫-এ উন্নীত করা হয়েছে।

সংরক্ষিত আসনে পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত। এ আসনগুলির নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমন্ডলী হলেন জাতীয় সংসদের সদস্যগণ। ফলে সংরক্ষিত আসনের জন্য নির্বাচন বাংলাদেশে কোনো সময়ই হয় নি, যা হয়েছে বা হয় সেটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনয়ন।  [শওকত আরা হোসেন]

আইনগত মর্যাদা  দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা কতটা সমতা ভোগ করছে আইন কাঠামো এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নারীর অধিকার রক্ষাকারী আইনসমূহ নারীর অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক সমতার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে নারীর অধিকার সুরক্ষায় আইন ন্যায়সঙ্গত হস্তক্ষেপ করতে পারে।

বাংলাদেশে নারী-পুরুষ কর্তৃক ভোগকৃত মৌলিক অধিকারের মূল উৎস হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পর্কে রয়েছে দুই ধরনের আইন: দেওয়ানি ও ব্যক্তিগত। দেওয়ানি আইন সংবিধান প্রদত্ত নারীর অধিকার এবং ব্যক্তি-আইন পারিবারিক জীবনে নারীর অধিকার রক্ষা করে।

বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার ঘোষণা করে এবং তাতে রাষ্ট্রকে এই লক্ষ্যে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণে নিদের্শনা দেয়। সংবিধানের ১৯ ধারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্পূর্ণ বাতিল করে নারীর রাজনৈতিক সমঅধিকারের স্বীকৃতি দেয়।

সংবিধানের ২৭ ধারা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করে যে, সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের মাধ্যমে অভিন্ন সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। ২৮ ধারা রাষ্ট্রকে ‘মহিলা বা শিশু অথবা সমাজের যেকোন পশ্চাদপদ অংশের উন্নয়নের জন্য’ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নিদের্শনা দিয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্যের বিলুপ্তি বিষয়ক জাতিসংঘ সনদ (UNCEDAW) অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

তবে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের মধ্যেকার সমানাধিকার ব্যক্তিজীবনের (অর্থাৎ পৈতিৃক উত্তরাধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের) সর্বক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয় নি। সরকার কর্তৃক সমর্থিত জাতিসংঘের বৈষম্য বিলুপ্তি সম্পর্কিত কনভেনশনকে পরিবারের আওতায় সমানাধিকারের বিধানসমূহের ক্ষেত্রে শর্তাধীন করা হয়েছে। এটা হলো লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার জন্য UNCEDAW অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার প্রদর্শিত আন্তরিকতা থেকে সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। দেওয়ানি আইনে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীনতা বজায় থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু এ সকল আইনের কয়েকটি স্পষ্টত নারীর ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক। ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইন এধরনের বৈষম্যের একটি উদাহরণ যা নারীর জন্য পুরুষের মতো আইনগত সমানাধিকার ভোগের সুযোগ সঙ্কুচিত করেছে।

ফৌজদারি আইনসমূহ ধর্মীয় আইনের ওপর ভিত্তিশীল নয়। তবু এসব আইন কিছু ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান ফৌজদারি আইনে ধর্ষণ একটি যৌন সহিংসতা, কিন্তু একজন মহিলার ক্ষেত্রে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ খুবই কঠিন করা হয়েছে, কেননা এজন্য সাক্ষ্যপ্রমাণবিধি মোতাবেক ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্ষণের আলামত এবং তা যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছে ধর্ষিতাকেই তা প্রমাণ করতে হয়। এ আইন নির্যাতিত ও অভিযুক্তকে অভিন্ন অবস্থানে রেখেছে, কেননা আইন মোতাবেক নির্যাতিতাকে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়।

সংবিধান শিল্পখাতে বিদ্যমান শ্রম-আইন বৈষম্যহীন ও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু বাস্তবে এসকল আইন থেকে নারী-শ্রমিকরা খুব কমই নিরাপত্তা পেয়ে থাকে। কারখানাস্থলে বিরাজমান ব্যবস্থায় পরিচালকদের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার সুযোগ রয়েছে। অবিবাহিত নারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিক নিয়োগ এবং নারী শ্রমিকদের অবেক্ষাধীন মেয়াদ  আইনগত মেয়াদের চেয়ে অতিরিক্ত হওয়ায় অনেক নারী-শ্রমিক তাদের বৈধ/আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অনানুষ্ঠানিক খাতে নারী-শ্রমিকদের ব্যাপক সংখ্যাবৃদ্ধি সত্ত্বেও তাদের অধিকারসমূহ আইন দ্বারা সুরক্ষিত নয়।

সংবিধান নারীর অধিকার ও মর্যাদার যে নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং সামাজিক নিয়মাচার ও রীতি হিসেবে ব্যক্তি-আইনে যা প্রতিফলিত হয়েছে এ দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করে সেই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তি-আইন বস্ত্তত পারিবারিক আইনসমূহের ভিত্তি। সুতরাং বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব, শিশু-রক্ষা ও উত্তরাধিকার বিষয়ে দেওয়ানি আইন ও ব্যক্তি-আইন নারী-পুরুষের ব্যবধান অব্যাহত রেখে চলেছে।

মুসলিম আইন অনুসারে বিবাহ হলো দু’ব্যক্তির মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি এবং এই চুক্তির বৈধতার জন্য দু’জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষের সম্মতি প্রদান অত্যাবশ্যক। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা হচ্ছে: মেয়েকে বাল্যাবস্থায় পিতামাতা বিয়ে দিলে মেয়েটি সাবালেগ হওয়ার পর অবশ্যই সে তা অনুমোদন বা বাতিল করতে পারবে। বাল্যবিবাহ রোধের পদক্ষেপ হিসেবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ (১৯৮৪ সালে সংশোধিত) নারী-পুরুষের বিয়ের ন্যূনতম বয়স বাড়িয়ে সংশোধিত আইনে নারীর জন্য ১৮ ও পুরুষের জন্য ২১ বছর নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে এটির প্রয়োগ খুবই সীমিত এবং এ আইনভঙ্গের জন্য মামলা দায়ের হয়েছে এমন নজীর খুবই কম। আইনটি ভঙ্গের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও এতে এধরনের বিবাহ অবৈধ ঘোষণার কোনো বিধান নেই। ইসলাম সীমিত আকারে বহুবিবাহ অনুমোদন করে যেখানে একজন ব্যক্তি বিশেষ শর্তাধীনে একসঙ্গে ৪ জন স্ত্রী রাখতে পারে: (ক) স্ত্রীদের মর্যাদানুযায়ী ভরণপোষণ দেওয়ার ক্ষমতা স্বামীর থাকতে হবে; (খ) স্বামী সকল স্ত্রীকে সমান ভালোবাসা দিবে এবং সকলের প্রতি সমদর্শী হবে। কিন্তু এ ধরনের নির্দেশাবলি কার্যকর করার পদ্ধতির অভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ স্ত্রীগণ সাধারণত স্বামীর অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।

এসকল স্ত্রীর সুরক্ষা বিধানের জন্য ১৯৬১ সালের পারিবারিক অধ্যাদেশে সালিস পরিষদ এবং বর্তমান স্ত্রী/স্ত্রীগণের লিখিত পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্য কোনো বিবাহের চুক্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন ভঙ্গকারীর জন্য শাস্তি হিসেবে রয়েছে তাৎক্ষণিক পুরো দেনমোহর বা মোহরানা (স্ত্রীর কাছে স্বামী কর্তৃক একটি নির্ধারিত অঙ্কের অর্থ প্রদানের অঙ্গীকার) পরিশোধ। স্ত্রীর চাহিদানুযায়ী তলবী মোহরানা সঙ্গে সঙ্গে এবং স্থগিত মোহরানা বিবাহ বিচ্ছেদের সময় পরিশোধ করতে হয়। শাস্তির মধ্যে আরও আছে ১ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা ৫০০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড। কিন্তু এ অধ্যাদেশে পরবর্তী বিবাহ অবৈধ ঘোষণার কোনো বিধান নেই।

মুসলিম আইনের অধীনে নিম্নোক্ত যেকোন একটি উপায়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটানো যায়: (ক) আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে; (খ) ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ অনুযায়ী স্ত্রীর অনুরোধে আদালতের ডিক্রি অনুসারে এবং (গ) কোনো কারণ প্রদর্শন ব্যতিরেকে স্বামীর ইচ্ছানুযায়ী।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে সাক্ষীদের সম্মুখে বিবাহ বিচ্ছেদের অভিপ্রায় প্রকাশের এবং চূড়ান্ততালাক সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া সংশোধিত হয়েছে। অনুসৃত কার্যক্রম অনুযায়ী তালাক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না। বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে প্রেরিত বিজ্ঞপ্তি ও বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার মধ্যে ৯০ দিনের ব্যবধান থাকতে হবে।

মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রার কর্তৃক কাবিন রেজিস্ট্রির সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদান করলেই কেবল মুসলিম নারী ইচ্ছানুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার পায়। অবশ্য স্ত্রী কোর্ট-ডিক্রির মাধ্যমে তালাক গ্রহণ করতে পারলেও তা একটি অনিশ্চিত, ব্যয়বহুল ও প্রলম্বিত জটিল পদ্ধতি। এর ফলে আইন সংস্কার হওয়া সত্ত্বেও বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য টিকে আছে।

মুসলিম আইন অনুসারে মৃত স্বামীর সগোত্রীয় উত্তরাধিকারী থাকলে স্ত্রী সম্পত্তির নির্দিষ্ট অংশ হিসেবে এক-অষ্টমাংশ পায়,  আর সেরকম উত্তরাধিকারী না থাকলে পায় মৃত স্বামীর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ।

একমাত্র কন্যা মৃত পিতা বা মাতার অর্ধেক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। পুত্র ছাড়া একাধিক কন্যা থাকলে কন্যাগণ যৌথভাবে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশের অধিকারী হয়। যদি সেখানে কোনো পুত্র (বা পুত্রগণ) থাকে তাহলে কন্যা অথবা প্রত্যেক কন্যার অংশ হবে পুত্র বা পুত্রদের অংশের অর্ধেকের সমান। এক কথায়, পুরুষ সদস্যরা নারী সদস্যদের চেয়ে বেশি সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। সুতরাং উত্তরাধিকারের বিষয়েও ব্যক্তি-আইনে বিস্তর লিঙ্গবৈষম্য বিদ্যমান।

মুসলিম আইন অনুসারে মা কখনও সন্তানদের অভিভাবকত্বের অধিকারী নন। এ অধিকার পিতার ওপর এবং তারপরে তার পিতা ও ভাইদের ওপর ন্যস্ত থাকে। মা ৭ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্রসন্তানদের ও কন্যাসন্তান সাবালিকা না হওয়া পর্যন্ত তাদের যত্ন করার ও অভিভাবকত্বের অধিকারী।

১৮৯০ সালের প্রতিপাল্য ও অভিভাবকত্ব আইন দ্বারা সংশোধিত আইনসমূহে বলা হয়, পিতামাতার অধিকারের চেয়ে সন্তানদের কল্যাণ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। একজন মায়ের কাছে নির্ধারিত বয়সের পরেও সন্তানরা থাকতে পারে যদি আদালত সন্তোষজনভাবে মনে করে যে, সন্তানরা পিতার নিকট যথেষ্ট যত্ন পাবে না। মা আদালতে সন্তানদের অভিভাবকত্ব দাবি করে আবেদন করতে পারেন। কিন্তু এটি একটি প্রলম্বিত ও ব্যয়বহুল মামলা। পিতা বিশেষ পরিস্থিতিতে সন্তানের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, কিন্তু মায়ের সেই অধিকার নেই; এমনকি সন্তানের অভিভাবকত্ব পেলেও মা আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া তা পারেন না। একজন মুসলমান মা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পুত্রের কাছ থেকে নিজ ভরণপোষণ লাভের অধিকারী। (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১)।

বর্তমান আইনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ বাধ্যতামূলক। বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রিকরণ আইন, ১৯৭৪ নামে একটি আইনও রয়েছে। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, গ্রামের অধিকাংশ বিবাহ রেজিস্ট্রি করা হয় না। আবার বাল্যবিবাহ নিরোধের আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও ১৮ বছরের অনেক কমবয়সী মেয়েদেরও বিয়ে দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে জন্মনিবন্ধীকরণ রীতির অভাবে এ আইনটির বাস্তবায়ন যথেষ্ট কঠিন। ধর্মীয় বিধি অনুসারে মোহরানার (স্ত্রীকে প্রদেয় অর্থ) ব্যবস্থা থাকলেও খুব কমক্ষেত্রেই তা পরিশোধ করা হয়। বাস্তবে সমাজে এখন যৌতুকপ্রথা (বিবাহে বিয়ের কনের অভিভাবক কর্তৃক অর্থ, গহনা ও বিলাসদ্রব্যাদি উপহার) চালু রয়েছে এবং তা একটি সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। যৌতুক পরিশোধ না করায় প্রায়শই অনেক মহিলার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে।

নারীদের আইনগত মর্যাদা উন্নয়নের জন্য মহিলা সংগঠনসমূহের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে সরকার কখনো কখনো বিদ্যমান আইনগুলি সংশোধন ও নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে: মুসলিম ব্যক্তি-আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন ১৯৩৭; মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯; মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (১৯৮৬ সালে সংশোধিত); মুসলিম পারিবারিক আইন বিধি ১৯৬১; মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ রেজিস্ট্রেশন বিধি ১৯৭৪; মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৭৫; মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯; পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫;  পারিবারিক আদালত বিধি ১৯৮৫;  বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০;  সাক্ষ্য-প্রমাণ আইন ১৯৮০; দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৩;  ফৌজদারি আইন সংশোধনী আইন ১৯৩৮; অনৈতিক কর্মকান্ড দমন আইন ১৯৩৩;  যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৮০;  নারী-নির্যাতন (প্রতিরোধমূলক শাস্তি) আইন ১৯৮৩; নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯৫; এবং  মাতৃত্ব সুবিধা আইন ১৯৩৯।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আইনসমূহ প্রযোজ্য হলেও বিবাহ, বিবাহ-বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও অভিভাবকত্বের মতো ব্যক্তিগত বিষয় হিন্দু ব্যক্তি-আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ সকল আইন ১৯৪৭ থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে।

হিন্দুধর্ম মতে বিবাহ চুক্তি নয়, বরং একটি অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় বিধান। একজন হিন্দু পিতার প্রধান কর্তব্য হলো কন্যার বিবাহ দান। হিন্দুধর্মে বিবাহে মেয়ের সম্মতি নিষ্প্রয়োজন, বিবাহ বিচ্ছেদযোগ্য নয় এবং অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহ অনুমোদিত। পিতা যেখানে সর্বদাই সন্তানদের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারী সেখানে মাতা অভিভাবক হতে পারলেও তার অধিকার পিতার চেয়ে কম। সকল কন্যা সন্তান উত্তরাধিকার বিষয়ে সমানাধিকারী নয়। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অবিবাহিত ও বিবাহিত সপুত্রক কন্যাগণ উত্তরাধিকারী হতে পারে। সন্তান ধারণের ক্ষমতার বয়স অতিক্রান্ত এমন বিবাহিত কন্যা বা পুত্রহীনা বিধবা কন্যারা উত্তরাধিকারী হতে পারে না। হিন্দু আইনে দত্তক অনুমোদিত, কিন্তু শুধু ছেলেরাই দত্তক হিসেবে গ্রহণযোগ্য। [খালেদা সালাহ উদ্দীন]

নারী নির্যাতন  বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন ১৯৯৫ নারীর প্রতি সহিংসতাকে নারী-পুরুষ সম্পর্কে একটি অন্যতম সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছে। উক্ত সম্মেলন মনে করে, পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ বিশ্বময়। তবে উন্নত বিশ্বের চেয়ে উন্নয়নশীল দেশসমূহে নারী নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেশি।

নারী নির্যাতন বলতে সাধারণত বলপূর্বক নারীর উপর শারীরিক, মানসিক অথবা লিঙ্গ নির্যাতনকে বুঝায়। এ সহিংসতা হতে পারে ব্যক্তিক, পারিবারিক বা দলীয়। নারী পুরুষের অসম সামাজিক অবস্থান ও অসম অধিকার সহিংসতার সূতিকাগৃহ। পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতায় নারীর অধস্তনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বিভিন্ন আইন-কানুন, আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির মাধ্যমে যা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নারী সহিংসতায় ব্যবহূত হয়। নারী হওয়ার কারণে গৃহে অন্তরীণ থাকা, বোরখা ব্যবহার করা, অসম উত্তরাধিকার ভোগ করা, পরিবার ও সমাজে অধস্তন ভূমিকা পালন করা এবং আরও অসংখ্য বৈষম্যমূলক আচরণ নারীর প্রতি এক ধরনের নীরব সহিংসতা। ঐ সহিংসতা থেকেই উদ্ভূত শারীরিক ও লিঙ্গীয় সহিংসতা।

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন একটি বড় সমস্যা। এদেশে শতকরা ১৪ ভাগ মাতৃমৃত্যু ঘটে নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে। এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে অহরহ। সহিংসতায় গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হবার ঘটনা নিত্যদিনকার। মানবাধিকার প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, নারীর প্রতি অপরাধ প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নারী নির্যাতনের প্রধান ক্ষেত্র হলো: (১) লিঙ্গ নির্যাতন, (২) ধর্ষণ, (৩) জখম ও হত্যা, (৪) মেয়ে শিশু/ভ্রূণ হত্যা, (৫) ফতোয়া, (৬) যৌতুক, বিয়ে বা তালাকের কারণে জখম ও হত্যা, (৭) ব্যভিচার, (৮) পতিতাবৃত্তি, ও (৯) নারীপাচার।

পারিবারিক পরিমন্ডলেই নারী নির্যাতন সবচেয়ে বেশি হয়। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে নারীরা পুরুষের আজ্ঞাধীন। বাংলাদেশ সংবিধানে নারীপুরুষ সম্পর্ক বৈষম্যহীন করা হয়েছে। এ নীতি কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে নারী সহিংসতা রোধকল্পে বিভিন্ন আইনও প্রণয়ন করেছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ ও অন্যান্য উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এই মন্ত্রণালয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন: (১) লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন, (২) মহিলা সহায়তা কর্মসূচি প্রকল্পের আইনগত সহায়তা, (৩) নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল হতে আইনি সহযোগিতা, (৪) নির্যাতিত নারী ও শিশু আবাসন ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নির্যাতিত নারী ও শিশুকে আশ্রয়, চিকিৎসা, প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন পেশায়  প্রশিক্ষণ দান, (৫) নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাকুরি বিনিয়োগ তথ্য কেন্দ্র, কম্পিউটার অপারেটিং কোর্স, শর্টহ্যান্ড, টাইপ রাইটিং ও বিভিন্ন কোর্সে প্রশিক্ষণ পরিচালনা যা নারীদের চাকুরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক গৃহীত নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাগত জানিয়েছে। উল্লেখ্য, কয়েকটি ধারা ব্যতীত বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য অপনোদন কনভেনশনে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্বনারী সম্মেলনে গৃহীত ১২টি বিবেচ্য বিষয়ের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে যে পদক্ষেপগুলির সুপারিশ করা হয়েছে তার প্রতিও বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। 

সূত্র: বাংলাপিডিয়া

ঢাকা, রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // অা হ এই লেখাটি ১৬১১ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন