সর্বশেষ
মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯ | ০৪ অক্টোবর ২০২২

উচ্চাঙ্গ সংগীতে খেয়াল গান

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০১৫

985131228_1446728526.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
এর আগে আমরা আলোচনা করেছি উচ্চাঙ্গ সংগীত নিয়ে। খেয়ালও এক ধরনের উচ্চাঙ্গ সংগীত। এটি উচ্চাঙ্গ সংগীতের দ্বিতীয় শাখা; প্রথম শাখা ধ্রুপদের চেয়ে এটি লঘু এবং এতে কল্পনা অনুযায়ী নানাবিধ অলঙ্কার প্রয়োগ ও তানবিস্তার দ্বারা সৌন্দর্য রচনার সুযোগ আছে। খেয়াল ধ্রুপদের মতো কঠোর নিয়মশৃঙ্খলে আবদ্ধ নয়।

আরবি খেয়াল শব্দের অর্থ হলো ইচ্ছা, খুশি। অনেকে মনে করেন, ধ্রুপদের কঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে−এই ধারার গানে স্বাধীনভাবে রাগের নানা রূপচিত্র নির্মাণ করার স্বাধীনতা আছে, এই অর্থে খেয়াল শব্দটি এসেছে।

কেউ কেউ মনে করেন প্রাচীন কৈবাড় নামক প্রবন্ধগান বা একতালী (রসিক গান) থেকে খেয়ালের উৎপত্তি ঘটেছিল। আবার বলা হয় প্রাচীন আক্ষিপ্তিকা নামক গান থেকে এই গানের উৎপত্তি।

খেয়ালের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে; তবে যে মতবাদটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তা হলো:  কাওয়ালি থেকে খেয়ালের উৎপত্তি হয়েছে। দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কাওয়াল নামক একটি যাযাবর সম্প্রদায় সাধারণত ভক্তিমূলক যে গান গাইত তার নাম কাওয়ালি। এ কাওয়ালি থেকেই কালক্রমে খেয়াল গানের উৎপত্তি হয়। বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু (১২৫৩-১৩২৫) কাওয়ালি গানের সংস্কার করে একে একটি প্রথাবদ্ধ রূপদানের মাধ্যমে খেয়াল গানের সূচনা করেন।

খেয়াল দুই প্রকার–ছোট খেয়াল (Fast Kheyal) ও বড় খেয়াল (Slow Kheyal)। আমীর খসরু প্রবর্তিত খেয়ালই ছোট খেয়াল এবং পনেরো শতকে জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ্ শর্কী যে খেয়াল প্রবর্তন করেন তা বড় খেয়াল নামে পরিচিত। উপরিউক্ত দু’প্রকার খেয়ালেই দুটি বিভাগ থাকে–স্থায়ী ও অন্তরা; আবার প্রতিটি বিভাগে থাকে দুটি বা তিনটি করে চরণ।

ছোট খেয়াল চপল গতির, তাই এর রচনা খুব সংক্ষিপ্ত। এর স্থায়ী ও অন্তরা সাধারণত দু’চরণে রচিত। এ গানের বন্দিশ সাধারণত ত্রিতাল বা দ্রুত একতালে বাঁধা হয়। ছোট খেয়ালে বিস্তারের সুযোগ নেই। প্রথমে মধ্যলয়ে, পরে দ্রুতলয়ে গান শেষ করা হয়। গানকে ছোট-বড় তান, বোলতান, সরগম ইত্যাদির মাধ্যমে অলঙ্কৃত করা হয়।

বড় খেয়াল বিলম্বিত লয়ের। এতে বিলম্বিত লয়ে বিশেষ প্রণালীতে আলাপ করা হয়, যাকে বলা হয় বিস্তার। বড় খেয়ালের সঙ্গে আ-কার বা বাণী যোগ করে মন্থর গতিতে এর বিস্তার ঘটানো হয়। এতে স্থায়ী ও অন্তরা উভয়েরই বিস্তার হয়। বিস্তার হওয়ার পর চারগুণ বা আটগুণ লয়ে অধিকাংশ তান করা হয়। এতে বিভিন্ন প্রকার তান ও বোলতান করারও নিয়ম আছে। বড় খেয়ালে স্পর্শ স্বরের প্রয়োগ দ্বারা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়।

খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে দিল্লির সম্রাট মহম্মদ শাহ-এর সভা সঙ্গীতজ্ঞ তানসেন বংশীয় সদারঙ্গ এই গানের উৎকর্ষতা দান করেন। মূলত আধুনিক খেয়াল গানের জনক হিসেবে সদারঙ্গকে মান্য করা হয়। এরপর সদারঙ্গের উত্তরপুরুষ এবং শিষ্যরা খেয়ালের প্রচার ও প্রসার ঘটায়। বিশেষত সদারঙ্গের জ্যেষ্ঠপুত্র অদারঙ্গ খেয়াল গান প্রচারে বিশেষ অবদান রাখেন।

গোড়ার দিকে খেয়ালের একটি ঘরানা ছিল। একে বলা হতো কওয়াল ঘরানা। এই ঘরানা আদি হলেও বর্তমানে এর অস্তিত্ব নেই। কালক্রমে সদারঙ্গ এবং অদারঙের শিষ্যরা তাঁদের নবতর খেয়াল শৈলী নিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। এঁরা তাঁদের নিজ নিজ বাসস্থানে এই গানের চর্চা করতে গিয়ে নানারকম উপকরণ এবং গায়নশৈলী যুক্ত করেন। এঁদের শিষ্যরা আবার গুরুর গায়ন পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চর্চা করার মধ্য দিয়ে পৃথক পৃথক শৈলীকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন স্থানিক ঘরানা।

যদিও বর্তমানে বিভিন্ন ঘরানা মিলে মিশে একাকার হয়ে মিশ্র রীতির সৃষ্টি করে চলেছে। একালের কোনো শিল্পীই নিষ্ঠার সাথে কোনো ঘরানাকে অনুসরণ করে চলছেন না। সদারঙ্গের আমল থেকে এখন পর্যন্ত যে সকল ঘরানার নাম পাওয়া যায়, সেগুলোর বর্ণানুক্রমিক তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো।

অত্রৌলী ঘরানা, আল্লাদিয়া খাঁর ঘরানা, আগ্রা ঘরানা, কিরনা ঘরানা, গোয়ালিয়ার ঘরানা, জয়পুর ঘরানা, তিলমণ্ডী ঘরানা, দিল্লী ঘরানা, পাঞ্জাব ঘরানা, পাতিয়ালা ঘরানা, বারনসী ঘরানা, রঙ্গীলে ঘরানা, রামপুর ঘরানা, লক্ষ্ণৌ ঘরানা, সেকেন্দ্রাবাদ, ঘরানা, হাপুর ঘরানা ইত্যাদি।

খেয়াল এক চমৎকার সঙ্গীতশৈলী। এর বিষয় সাধারণত শৃঙ্গাররসাত্মক এবং এর প্রকাশ ঘটে সঙ্গীতের শিল্পসৌন্দর্যের মাধ্যমে। খেয়ালে ভক্তিরসেরও প্রাধান্য থাকে। হিন্দি ও উর্দু ভাষায় খেয়ালগুলি রচিত। খেয়াল গানের সঙ্গে তালযন্ত্র হিসেবে তবলা সঙ্গত করা হয়। একতাল, ত্রিতাল, আড়াচৌতাল, ঝুমরা ইত্যাদি তাল খেয়ালের সঙ্গে বাজানো হয়।

সুন্দর তাল ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী গীত হলে খেয়াল শ্রোতার মনে অপূর্ব আনন্দ সঞ্চার করে। তাই সঙ্গীতজগতে খেয়াল বেশ জনপ্রিয় এবং অধিক প্রচলিত একটি গায়ন পদ্ধতি। বর্তমানে রাগসঙ্গীতের শাখাসমূহের মধ্যে খেয়ালের স্থান সর্বাগ্রে। বাংলায় যেসব সঙ্গীত-ঘরানার প্রচলন আছে, সেসবের মধ্যে খেয়াল-ঘরানা অন্যতম।

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // অা হ এই লেখাটি ২৬৪১ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন