সর্বশেষ
শুক্রবার ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৬ নভেম্বর ২০১৮

স্টিভেন স্পিলবার্গ : এক কিংবদন্তির ইতিহাস

বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০১৫

630536679_1449043858.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

স্টিভেন স্পিলবার্গকে বলা হয় হলিউড চলচ্চিত্রের যাদুকর। তার ক্যামেরায় দৃশ্যধারণ মানেই দর্শকের জন্য নতুন কোনো শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি। প্রতি মুহূর্তে নতুনত্বের সন্ধানী, প্রাচীন পৃথিবী থেকে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর রহস্য খোঁজাই স্পিলবার্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

চলচ্চিত্র যে শুধুই শিল্প নয়, বিশাল একটি বাণিজ্য ক্ষেত্রও, ছবি তৈরি করেও যে বিলিয়ন ডলারের মালিক হওয়া যায় তার প্রমাণ স্পিলবার্গ। এখন পর্যন্ত হলিউডের বিশাল ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতে যতো মেধাবী পরিচালক-প্রযোজক এসেছেন তাদের মধ্যে স্পিলবার্গ নিঃসন্দেহে অন্যতম।

এমনও কথা চালু আছে যে, তাকে ঘিরেই এখন সারা হলিউড ঘুরে। এমন সব বিস্ময়কর কাণ্ড তিনি করেছেন যে, শুধু হলিউড নয়, সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র জগৎই তাকে একজন আইকন হিসেবে বিবেচনা করে। তার বিরুদ্ধে দাঁড় করা হয়েছে ফরাসি চলচ্চিত্রের দিকপাল পরিচালক জাঁ লুক গদারকে। গদার তার এক সাক্ষাৎকারে স্পিলবার্গ সম্পর্কে বলেছেন, স্পিলবার্গকে একজন ব্যক্তি হিসেবে ভাবা ঠিক হবে না, স্পিলবার্গ হলিউডের একটা ধারার প্রবর্তক। সত্যিই তাই। স্পিলবার্গ এসেই হলিউড চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা মেজাজে ভাসিয়ে নিতে শুরু করেছেন।

সম্প্রতি হলিউডের একটি সাংবাদিক দল শ’আটেক পরিচালকের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়েছিলো। তাতে দেখা গেছে দর্শক টানার ব্যাপারে, ছবি রিলিজ এবং ডিস্ট্রিবিউশন-এর ব্যাপারে, সর্বোপরি লগ্নি করা টাকা নিশ্চিন্তে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কেউই স্পিলবার্গের ধারে-কাছে আসেন না। তিনি সবচেয়ে ব্যাঙ্কেবল পরিচালক হিসেবে পরিগণিত। এমন ঘটনা স্পিলবার্গের জন্য নতুন নয়। এর আগেও কয়েকবার এরকম প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন তিনি। ষাট বছর বয়সে পৌঁছে একই সঙ্গে শিল্পসৌকর্যে নিজের ছবিকে ভরিয়ে তোলা, আবার সে ছবিকেই বাণিজ্যিকভাবে চূড়ান্ত সফল করা -খুব একটা সহজ কাজ নয়। অথচ সে কাজটিই বছরের পর বছর ধরে করে যাচ্ছেন স্পিলবার্গ। অনন্য সাধারণ প্রতিভাবান মানুষ না হলে এটা সম্ভব হতো না। প্রতি মুহূর্তে সৃজনশীলতায় ও সৃষ্টিশীলতায় স্পিলবার্গ নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে গেছেন।

আর তাই চলচ্চিত্রের নোবেল পুরস্কার খ্যাত অস্কার ছাড়াও ভূষিত হয়েছেন দেশী-বিদেশী অসংখ্য পুরস্কারে। পেয়েছেন ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পুরস্কার নাইটহুড উপাধি। সাধারণত ব্রিটিশ নন- এমন কাউকে এ-উপাধি দেয়া হয় না, কিন্তু স্পিলবার্গের মতো প্রতিভাবান ব্যক্তির বেলায় নিশ্চয়ই এ নিয়ম খাটে না। হ্যাঁ, শুধু তার নিজের দেশ আমেরিকা নয়, প্রিয় দেশ ইংল্যান্ড নয়, পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষই এই অসাধারণ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কোটি কোটি মানুষ তাকে ভালোবেসে হৃদয়ে ঠাঁই দিয়েছেন। অগণিত মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার টান কখনও উপেক্ষা করেননি তিনি। প্রিয় মানুষের মন জয় করার জন্য একের পর এক নির্মাণ করে চলেছেন কালজয়ী সব চলচ্চিত্র। তার ক্যামেরা যেন সত্যিই কোনো মায়াময় যাদুবক্স। যেখান থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক বিস্ময়কর রাজ্য।

যেভাবে তার গল্প শুরুঃ

স্টিভেন স্পিলবার্গের জন্ম উত্তর আমেরিকার নিউ জার্সি শহরের সিনসিনাটিতে, ১৯৪৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর। তিার জন্মের পর তার পরিবার নিউ জার্সি থেকে ফিনিক্স শহরের কাছে স্কটসডেলে চলে আসে। তার বাবা আর্নল্ড ছিলেন একজন ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার। মা লিয়া ছিলেন একজন চমৎকার পিয়ানো বাদক। খুব ছোটবেলা থেকেই স্পিলবার্গ পরিচালক হবার স্বপ্ন দেখতেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নির্মাণ করেন ৪০ মিনিটের একটি ছবি ‘এসকেপ টু নোহোয়ার’। এক প্রতিযোগিতায় ছবিটি একটি পুরস্কারও জিতে নেয়। তারপর ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্পিলবার্গ ‘ফায়ারলাইট’ নামে একটি ছবি প্রযোজনা করেন। যে ছবি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরবর্তীতে তিনি ‘ক্লোজ এনকাউন্টার’ ছবিটি নির্মাণ করেছেন।

শুনতে আশ্চর্য হলেও এ কথা সত্য যে, তার প্রথম প্রযোজিত ছবিটি স্থানীয় মুভি থিয়েটার থেকে প্রায় ১০০ ডলার প্রফিট অর্জন করে নেয়। সেই বয়সের একটা ছেলের কাছে এ-ই বা কম কী! সেসব ছিলো কেবল তার প্রস্তুতিপর্ব।

ফিল্ম জগতে বিচরণ করার অদম্য আগ্রহ থাকলেও প্রথম দিকে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা সে কেন্দ্রীক হয়ে উঠতে পারেনি। বাবার ইচ্ছায় জেনারেল শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে হয়েছিলো। কিন্তু, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে পড়তে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছিলেন, কোনোক্রমেই আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারছিলেন না। সেলুলয়েড ফিতার রূপালী জগৎ বারবার তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন। না, আর না। অনেক হয়েছে। এবার তাকে নিজের ইচ্ছে মতো নিজের পথে হাঁটতে হবে। ব্যস, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ফিল্ম ষ্টুডিওর দিকে হাঁটা দিলেন।

সাধ্যাতিত পরিশ্রম করে স্পিলবার্গ মুভি ইন্ডাষ্ট্রিতে নিজের জন্য একটু জায়গা করে নিলেন। ছোট্ট একটা ঘর ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করে প্রথম ষ্টুডিও এমব্লিন দাঁড় করালেন। সেসময় তাকে প্রতিদিন গেটের দারোয়ানের সাথে সুট-টাই পরে অফিসে ঢুকতে দেখা যেতো এবং সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করে ষ্টুডিও থেকে বের হতেন গেটে তালা দেবার সময়। ২৪ মিনিটের ছবির কাজ নিয়ে তিনি এমব্লিনের যাত্রা শুরু করলেন। এর জন্য এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করলেন ১৫,০০০ ডলার। এরপর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্রমশ শিখর থেকে আরো সুউচ্চ শিখরে উঠতে লাগলেন তিনি। স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলের সাথে সাত বছরের চুক্তিতে তৈরি করলেন কিছু টিভি ড্রামা, ফিচার ফিল্ম। যেমন, ‘দ্যা নাইট গ্যলারি’, ‘মারকাস ওয়েলবি এমডি’, ‘দ্যা নেম অব দ্যা গেম’, ‘ডুয়েল’। এসব কাজ স্পিলবার্গকে অন্যদের কাছ থেকে ব্যতিক্রম করে তুলছিলো। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে একই সাথে সমানে আসতে শুরু করলো তুমুল জনপ্রিয়তা ও ডলার।

সেসব কাজের মধ্যে দিয়ে স্পিলবার্গ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করলেও সবচেয়ে বড় পুরষ্কার ছিলো হলিউডের সুবিশাল ও সুপরিচিত ষ্টুডিও ইউনিভার্সেল থেকে কাজ করার আমন্ত্রণ। ইউনিভার্সেল ষ্টুডিওতে কাজ করার সুযোগ স্পিলবার্গের ক্যারিয়ারে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে দেয়।

ইউনিভার্সেল থেকে স্পিলবার্গ প্রথম ফিচার ফিল্ম তৈরি করেন ১৯৭৪ সালে। নাটকীয় কমেডি ভিত্তিক এ ছবিটির নাম ‘সুগারল্যান্ড এক্সপ্রেস’। সে বছর ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর চারদিকে আলোড়ন পড়ে যায় এবং ছবিটি কান চলচ্চিত্রের উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার জিতে নেয়। তারপরের বছরই, ১৯৭৫ সালে স্পিলবার্গ নির্মাণ করেন আরো একটি অসাধারণ ছবি ‘জ্যস’। ‘জ্যস’ স্পিলবার্গকে আন্তজার্তিকভাবে আরো সুপরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করে দেয়। ব্যাপক সফলতার সাথে ছবিটি বিভিন্ন দেশে সুপারহিট হবার পর ১৯৭৬ সালে এটি একাডেমি এ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনিত হয় এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথমবারের মতো স্পিলবার্গের কোনো ছবি এডিটিং, সাউন্ড ও অরজিনাল স্কোর এ তিনটি শাখায় অস্কার জিতে নেয়। এ ছবিটি পরবর্তীতে ১০০টি শ্রেষ্ঠ আমেরিকান ছবির অন্তর্ভূক্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা এ ছবিটির মধ্যে দিয়ে স্পিলবার্গ সর্ব সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে আসেন।

পরবর্তীতে আরো অনেক বিশাল প্রজেক্ট হাতে নিতে তাকে কোনো দুঃশ্চিন্তা করতে হয়নি। পুরো ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রি তার হাতের সুঠোয় চলে আসে। তারপর শুরু হয় তার একের পর এক বিস্ময়কর ভূবন সৃষ্টি। একের পর এক নির্মাণ করে চলেন ক্লোজ এনকাউন্টার উইথ দ্যা থার্ড কাইন্ড, ই.টি., রাইডার্স অফ দি লাস্ট আর্ক, সিন্ডলার’স লিস্ট, জুরাসিক পার্ক, সেভিং প্রাইভেট রায়ান-এর মতো পৃথিবী কাঁপানো দর্শকপ্রিয় সব ছবি। যা আজ স্পিলবার্গকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

টাকার পাহাড়ঃ

১৯৮২ সালে স্পিলবার্গ আরো বৃহৎ পরিসরে নিজেকে তৈরি করেন। এ বছর তার নিজস্ব ষ্টুডিও এমব্লিন প্রযোজনা শুরু করে ‘ই.টি’ ছবিটি দিয়ে। এতদিন এমব্লিন শুধু একটি পরিচালনা সংস্থাই ছিলো, এখান থেকে ছবি তৈরি করে স্পিলবার্গ অন্যসব ষ্টুডিওর মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউশন করতেন। এমব্লিন তখন ইউনিভার্সেল পিকচার ষ্টুডিও, কলম্বিয়া পিকচার ষ্টুডিও এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স ষ্টুডিও’র সহযোগিতায় কাজ করতো। কিন্তু, এখন থেকে এমব্লিন একাই সব কাজ করার জন্য প্রস্তুত। এও স্পিলবার্গের জন্য বিশাল এক সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে দেয়।

এমব্লিন থেকে তৈরি অনেক ছবি পরবর্তীতে আমেরিকান আইকন হিসেবে পরিচিত হয়। এমব্লিন থেকে স্পিলবার্গ এ পর্যন্ত আয় করেছেন ৫০০ মিলিয়ন ডলারের উপরে। কিন্তু, এখানেই সব নয়। স্পিলবার্গ প্রতি মুহূর্তে এগিয়ে গেছেন আরো দূর দিগন্তের দিকে। শুধু এমব্লিন থেকেই নয়, আরো কিছু ষ্টুডিওর সাথে স্পিলবার্গ শেয়ারে ব্যবসা করেন।

এমব্লিনের ১০০%ই তার মালিকানা। ড্রিম হাউজ ষ্টুডিও থেকে মাত্র ২২% শেয়ার-এ যাবৎ স্পিলবার্গ আয় করেছেন প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার। ড্রিম হাউজ হলিউডের সর্বোবৃহৎ ষ্টুডিওর একটি। বিভিন্ন ষ্টুডিও থেকে স্পিলবার্গের বার্ষিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মতো। স্পিলবার্গের মোট উপার্জন অনেক আগেই বিলিয়নের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। ভাবা যায়, শুধু ছবির ব্যবসা করে বিলিয়ন ডলারের মালিক! এটা শুধু স্পিলবার্গের ক্ষেত্রেই সম্ভব। আর কোনো পরিচালক-প্রযোজক তার ধারে-কাছেও নেই। এখন তিনি একা একটি জগৎ।

পরিবারের নিবিড় বন্ধনেঃ

এতো ব্যস্ত যে মানুষটি তিনিও পরিবারের প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যের জন্য কিছুটা সময় আলাদা করে রাখেন। শুধু কাজ পাগল মানুষ তো যান্ত্রিক। কিন্তু, এতো ব্যস্ততার ভিড়েও স্পিলবার্গের মধ্যে লুকিয়ে আছে চমৎকার একটি শিশুসুলভ মন। খুব ভালোবাসেন শিশুদের সাথে সময় কাটাতে। আর তাই নিজের সন্তান ছাড়াও পালক নিয়েছেন আরো দু'টো শিশুকে। মোট সাতটি সন্তান নিয়ে স্পিলবার্গের পারিবারিক জীবন। স্ত্রী কেইট কাপসাউ প্রথমে তার ছবির অভিনেত্রী ছিলেন। ‘ইউ অফ নাইট’, ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ এবং ‘টেম্পল অফ ডুম’ ছবিতে তিনি অনবদ্য অভিনয় করেছেন। কেইট রবার্ট নামে এক ব্যক্তিকে আগে একবার বিয়ে করেছিলেন। সেখানে তার এক মেয়েও আছে। রবার্টের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর ১৯৯১ সালে স্পিলবার্গের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্পিলবার্গও আগে দু’বার বিয়ে করেছিলেন। স্পিলবার্গ প্রথম বিয়ে করেন ১৯৭৯ সালে এমি আরভিংকে।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রঃ

ঠিক কতগুলো জনপ্রিয় ছবি ও টিভি সিরিজ স্পিলবার্গ নির্মাণ করেছেন তা হয়তো তিনি নিজেও বলতে পারবেন না। কারণ তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। তাই এক অর্থে স্পিলবার্গের সব কাজই উল্লেখযোগ্য। স্পিলবার্গের পরিচয় যে কেবল পরিচালক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকেছে তা নয়, প্রযোজক হিসেবেও তিনি উজ্জ্বল হয়ে আছেন। তার পরিচালিত ছবি মাত্র ৪৮টি। কিন্তু, প্রযোজিত ছবির সংখ্যা ১০৭টি। নিজের ছবি ছাড়াও অন্য অনেকের ছবি তিনি প্রযোজনা করে থাকেন। তাই ঠিক পরিচালক হিসেবে না প্রযোজক হিসেবে স্পিলবার্গ বেশি সফল সেটা নির্ধারণ করাটা কিছুটা বাদানুবাদপূর্ণই বটে। পরিচালক ও প্রযোজক, এর বাইরে আরও একটি পরিচয় আছে স্পিলবার্গের। তিনি একজন অভিনেতাও বটে। ‘অস্টিন পাওয়ারস ইন গোল্ডম্যাম্বার’, ‘ভেনিলা স্কাই’, ‘দ্যা লস্ট ওয়ার্ল্ড’, ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘ইউওর ষ্টুডিও এ্যান্ড ইউ’, ‘গ্রিমলাইন’, ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ‘দ্যা টেম্পেল অফ ডুম’, ‘দ্যা ব্লস ব্রাদার্স’, ‘জ্যস’, ‘সামথিং এভিল’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। আর চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে তার পরিচয় তো অনেক আগে থেকেই পরিচিত। তার অনেক জনপ্রিয় ছবির চিত্রনাট্য তার নিজেরই করা। এতো এতো কাজের মানুষটিকে নিয়ে কিছু লেখা কি চাট্টিখানি কথা! যাই হোক, এবার তার কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের নাম জানিয়ে দিচ্ছি আগ্রহী পাঠক ও তার ভক্ত-দর্শকদের জন্য।

১৯৫৭ সালে স্পিলবার্গ তার প্রথম ছবি পরিচালনা করেন। ক্ল্যাসিকেল ওয়েস্টার্ন গল্প ভিত্তিক নির্মাণ করেন ‘ওয়াগন ট্রেন’ নামে একটি স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এটা এক কৌতূহলী বালকের কাজ শেখার হাতেখড়ি মাত্র। তার চার বছর পর ১৯৬১ সালে ‘ব্যাটল স্কয়ার্ড’ নামে আরও একটি শর্টফিল্ম তৈরি করেন। এ বছরই তৈরি করেন ‘এসকেপ টু নোহোয়ার’। এটিও একটি শর্টফিল্ম। এগুলো তার কাজ শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু, তার পরের দু’বছর স্পিলবার্গ যে-দু’টি ছবি পরিচালনা করেন তাতেই তার ভবিষ্যৎ পরিচালনা-সত্ত্বা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে উঠে। ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় তার ‘ফায়ারলাইট’ ছবিটি। যে-ছবির গল্প হচ্ছে-মহাকাশ থেকে আসা একদল এলিয়েনকে নিয়ে, যারা পৃথিবীর ছোট্ট একটি শহরকে আক্রমণ করে। স্থানীয় মুভি থিয়েটারে ছবিটি স্পিলবার্গকে একজন ক্ষুদে পরিচালক হিসেবে প্রথম স্বীকৃতির দুয়ার খুলে দেয় স্পিলবার্গের বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর।

তার দু বছর পর স্পিলবার্গ ‘স্লিপস্ট্রিম’ নামে একটি ছবির কাজ হাতে নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটি শেষ করতে পারেননি। ১৯৬৮ সালে পরিচালনা করেন ‘এমব্লিন’ ছবিটি। এ ছবির মাধ্যমে তার নিজস্ব প্রোডাকশন্স হাউজ এমব্লিন একটি প্রযোজনা সংস্থা হিসেবেও যাত্রা শুরু করে। সবকিছু মিলিয়ে এমব্লিন ছবিও প্রযোজনা সংস্থা স্পিলবার্গের জীবনে নতুন পথের সন্ধান নিয়ে আসে। এরপর কয়েক বছর স্পিলবার্গ কিছু টিভি সিরিজ নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসব তাকে পরবর্তীতে একজন দক্ষ ও গুণী পরিচালক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

সে সময় তার নির্মিত কিছু উল্লেখযোগ্য টিভি-সিরিজ হচ্ছেঃ ‘নাইট গ্যালারি’ (১৯৭০), ‘দ্যা নেম অব দ্যা গেম’ (১৯৭১)’, ‘দ্যা সাইকিয়াট্রিস্ট’ (১৯৭১), ‘কলম্বোঃ মারডার বাই দ্যা বুক’ (১৯৭১), ‘ডুয়েল’ (১৯৭১), ‘সামথিং এভিল’ (১৯৭২), ইত্যাদি। এগুলো স্পিলবার্গকে পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়।

তারপর ১৯৭৪ সালে স্পিলবার্গ ‘সুগারল্যান্ড এক্সপ্রেস’ ছবিটি নির্মাণ করেন। এটা তার পরিচালনা সত্ত্বা বিকশিত হবার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ। তারপর ১৯৭৫ সালে ‘জ্যস’ ছবিটি নির্মাণের মধ্যে দিয়ে স্পিলবার্গ পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন দিকপাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭৭ সালে নির্মাণ করেন ‘ক্লোজ এনকাউন্টার অফ দ্যা থার্ড কাইন্ড’। ১৯৭৮ সালে পরিচালনার পাশাপাশি প্রযোজনা করেন প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রঃ ‘আই ওয়ানা হোল্ড ইউর হ্যান্ড’। ১৯৮০সালে নির্মাণ করেন ‘ইউস্ড র্কাস’ ছবিটি। ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্যা লস্ট আর্ক’। ১৯৮২ সালে স্পিলবার্গ দু’টি ছবি পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন। প্রথমটির নাম ‘পোলটারগিট’ এবং দ্বিতীয়টি সে সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও সব সময়কার জন্যই এলিয়ানদের নিয়ে একটি চমৎকার ছবি ‘ই.টি দ্যা এক্সট্রা টেরিস্ট্রিয়াল’।

এর মধ্যেই স্পিলবার্গ বেশ যশ-খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। ক্রমাগত তিনি হলিউড চলচ্চিত্র ধারাকে একটি নতুন ধারায় বিকশিত করতে থাকেন। ১৯৮৪ সালে স্পিলবার্গ ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ ও ‘টেম্পল অফ ডুম’ ছবি দু’টির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে বিশেষ ইফেক্ট সংযোজন করেন। যা ছবিতে নতুন একটি বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। তবে, এখানে একটা কথা যে, ৮০ দশকে স্পিলবার্গের ছবিগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফল হলেও বোদ্ধা-দর্শকদের দ্বারা দারুণ সমালোচিত হয়। বিশেষ  করে ১৯৮৪ সালে নির্মিত ‘গ্রিমলাইন’, ‘আমরিকান টেল’, ১৯৮৫ সালে নির্মিত ‘দ্যা গুনাইজ’ ইত্যাদি ছবিগুলোর জন্য স্পিলবার্গ দারুণ নিন্দিত হন। কেউ কেউ এমনও বলে যে, এগুলো নাকি কোন ছবিই না, চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করার জন্যই এসব ছবির লক্ষ্য।

কিন্তু, ১৯৮৭ সালে ‘এমপায়ার অফ দ্যা সান’ ছবিটি পরিচালনার মধ্য দিয়ে স্পিলবার্গ সব সমালোচনার জবাব দেন। নতুনভাবে বোদ্ধামহলের দৃষ্টি কাড়েন ও প্রশংসিত হন। কিন্তু, এসব স্তুতিবাক্য স্পিলবার্গকে বেশি দিন মুগ্ধ করে রাখতে পারেনি। শুধু আর্টফিল্ম টাইপের ছবি নির্মাণ করে বোদ্ধামহলের প্রশংসা কুড়োলেই তো হবে না, ছবিটি সর্বসাধারণের ভালো লাগতে হবে, লগ্নি করা টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে। এসব ভেবে স্পিলবার্গ আবার নিজের পথে হাঁটা শুরু করলেন।

আশির দশকের শেষ দিকে তিনি আবার বাণিজ্যিক ধারার উচ্চমার্গীয় হট্টগোল ধরনের ছবি বানাতে লাগলেন, যা টিনেজদের প্রবল আকর্ষণ করে এবং কোনো তত্ত্বকথা নয়, নিছক বিনোদন হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। ১৯৮৯ সালে নির্মাণ করেন বিগ বাজেটের তিনটি ছবিঃ ‘অলওয়েজ’, ‘লাস্ট ক্রসেড’, এবং ‘ব্যাক টু দ্যা ফিউচার পার্ট টু’। তিনটি ছবিই ব্যাপক সফলতার সাথে দর্শকের প্রশংসা অর্জন করে।

এসবের বাইরে আজীবনই স্পিলবার্গের প্রধান আকর্ষণ এনিমেশন ফিল্মের প্রতি। এ সময় তিনি কিছু এনিমেশন টিভি শো নির্মান করেন। যেমন, টিনি টোন এ্যাডভানচার্স’ (১৯৯৮), ‘এনিম্যানিএক্স’ (১৯৯৩), ‘ফ্যামেলী ডগ’ (১৯৯৩), ‘পিংকি এ্যান্ড ব্রেইন’ (১৯৯৫) ‘ফ্রিকাজুইড’ (১৯৯৫), ‘পিংকি’, ইলমিরা এবং দ্যা ব্রেইন’ (১৯৯৮), ‘টোলসেলভেনিয়া’ (১৯৯৮) ইত্যাদি। এগুলোর পাশাপশি তিনি কিছু কার্টুন ছবিও প্রযোজনা করেন।

’৯০ দশকে স্পিলবার্গ ঝড়ের মতো একের পর এক কাজ করে গেছেন। যেন তার কোনো থামার বিরাম নেই। কাজের পর কাজ, ছুটে চলার পর ছুটে চলা। এ সময়েই মুক্তি পায় তার জীবনের সবচেয়ে ব্যবসা সফল ও জনপ্রিয় দু’টি ছবি ‘জুরাসিক পার্ক ও ‘সিন্ডলার'স লিস্ট’। এ ছবি দু’টি প্রসংগে স্পিলবার্গ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সিন্ডলার'স লিস্ট ও জুরাসিক পার্ক সম্পূর্ণ দু’রকম দু’টি ছবি। প্রায় একই সময়ে আমি ছবি দু’টি নির্মাণ করেছি। কিছুটা আগে পরে। সিন্ডলার'স লিস্ট করার পর এর মতো সিরিয়াস ছবি আমি আর করতে চাইনি। যদিও ওই ছবিটি আমাকে বিশ্বসেরা পুরস্কার অস্কার এনে দিয়েছে। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম জুরাসিক পার্কের মতো কোনো হালকা ধরনের ছবি করতে যা ব্যবসায়িক সাফল্য পাবে, আবার পাবে দর্শকের প্রশংসাও।

সত্যি বলতে কি, তাতো হয়েছেই, আরো অনেক বেশি হয়েছে। আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছি দুটো ছবিতে।’

এমন উৎফুল্ল কথা স্পিলবার্গ বলতেই পারেন। কারণ তার যে- কোনো ছবি মুক্তি পাওয়ার প্রথম সপ্তাহেই দ্বিগুণ লাভ উঠে আসে। ‘জুরাসিক পার্ক’ দিয়ে স্পিলবার্গ সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিলেন। জুরাসিক পার্ক : পৃথিবী জুড়ে আদিম প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপ ডাইনোসরের রাজত্বের কাল; পর্দায় একেবারে বাস্তব চিত্র হয়ে দেখা দিলো। সারা পৃথিবীর মানুষ দম বন্ধ করা কিছু মুহূর্ত উপভোগ করলো এ ছবিতে।

এ ছবির ব্যাপক সাফল্যের পর ১৯৯৭ সালে স্পিলবার্গ নির্মাণ করলেন দ্বিতীয় জুরাসিক পার্কঃ ‘দ্যা লস্ট ওয়ার্ল্ড’। আবারও পৃথিবী কাঁপিয়ে দিলেন তিনি।

স্পিলবার্গের জন্মই হয়েছে একের পর এক বিস্মকর ছবি তৈরি করে পৃথিবী কাঁপানোর জন্য। কিন্তু, ১৯৯৮ সালে স্পিলবার্গ তার ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত রকমের একটি ছবি নির্মাণ করলেন ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’। এ ছবিটিকে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত শ্রেষ্ঠ একটি ছবি। এ ছবিটি ‘সেক্সপিয়র ইন লাভ’ ছবিটিকে হারিয়ে দিয়ে সে বছর শ্রেষ্ঠ একাডেমি এ্যাওয়ার্ড অস্কার জিতে নেয়। এর পর ২০০২ সালে স্পিলবার্গ আরো দু’টি অসাধারণ ছবি নির্মাণ করেন ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’, ‘ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান’। মাইনরিটি রিপোর্ট ছবিতে অভিনয় করেন হলিউডের এ সময়ের জনপ্রিয় নায়ক টম ক্রজ। ছবির কাহিনীটিও অদ্ভুত। এখানে স্পিলবার্গ আর ইতিহাস সন্ধানী নন, ভবিষ্যৎ সন্ধানী। ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন অপরাধের এখনই বিচার সম্পন্ন হয়ে যাবে এই হলো মাইনরিটি রিপোর্টের গল্প। টম ক্রজ একজন পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু, এক সময় সে নিজেই ভবিষ্যতে করতে পারে এমন এক অপরাধের কারণে অভিযুক্ত হয়ে যান। অন্যরকম চমৎকার একটি ছবি।

স্পিলবার্গের সর্বশেষ আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি হচ্ছে ‘ওয়ার অফ দি ওয়ার্ল্ড’। এ বছরই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন গত বছর। আশা করা হচ্ছে, এ ছবিটি স্পিলবার্গের জীবনের আরেকটি অনন্য ছবি হয়ে থাকবে। স্পিলবার্গের কর্মময় জীবনে এমন সাফল্যের চূড়া কতো-কতো তা ঠিক বলে শেষ করা যাবে না।


ঢাকা, বুধবার, ডিসেম্বর ২, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // আর এস এই লেখাটি ২১৬৩ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন