সর্বশেষ
মঙ্গলবার ৫ই মাঘ ১৪২৮ | ১৮ জানুয়ারি ২০২২

বাংলা কল্পবিজ্ঞানের জনক জগদীশ চন্দ্র বসু

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০১৫

1685135162_1440085527.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অসীমতার স্বরূপ বর্ণনা করতে বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র তার ‘আকাশ স্পন্দন ও আকাশ সম্ভব জগৎ’ নিবন্ধে একটি রূপক গল্পের আশ্রয় নিয়েছেন। গল্পটি এইরূপ,

‘জার্মান কবি রিকর্টা স্বপ্নরাজ্যে দেবদূতের সাক্ষাৎ পান। তার কাছে তিনি বিশ্ব রচয়িতার অনন্ত রচনা দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী দেবদূত তাকে পৃথিবীর আকর্ষণ মুক্ত করে অনন্ত আকাশপথে যাত্রা করেন। আকাশের উচ্চ হতে উচ্চস্তর ভেদ করে, সপ্তগ্রহ পশ্চাতে ফেলে, সৌররাজ্য ত্যাগ করে তারা তারকার রাজ্যে উপনীত হন। সেখানে দেখতে পান কোটি কোটি মহাসূর্যকে ঘিরে কোটি কোটি গ্রহ-উপগ্রহ আবর্তিত হচ্ছে। উর্দ্ধহীন, অধোহীন, দিকহীন অনন্ত। ধারণাতীত মহাব্রহ্মাণ্ডের অগ্রগণ্য সমাবেশ দেখে অবসন্ন অচেতন কবি মৃত্যু কামনা করেন। তিনি জানতে চান, এ জগতের শেষ কোথায়?

‘তখন দেবদূত কহিলেন, তোমার সম্মুখে অন্ত নাই। ইহাতেই কি তুমি অবসন্ন হইয়াছ? পশ্চাতে ফিরিয়া দেখ, এ জগতের আরম্ভও নাই। শেষও নাই।’  (পৃ:৩৭)

নিবন্ধের শেষ অংশে তিনি লিখেছেন, ‘এ জগতে ক্ষুদ্রও নাই, বৃহৎও নাই’। (পৃ:৩৯)

সত্যিই জগদীশচন্দ্র ক্ষুদ্রও নন, বৃহৎও নন; আমার চিন্তা চেতনায় তিনি এক অসীম ব্রহ্মাণ্ড। আমার অতি সামান্য জ্ঞান ও বুদ্ধিতে তার বিশালত্বকে ধারণ করা অসম্ভব। ভাষায় তাকে প্রকাশ করা যায়না। তাকে বিনম্র চিত্তে শুধু ভক্তি শ্রদ্ধা জানাতে পারি।

আচার্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী:

তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে Natural Science এ Tripos ডিগ্রী অর্জন করেন । একই সাথে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমএ পাস করেন (সূত্র: অধ্যাপক শিবাজী রাহা, এশিয়টিক সোসাইটি, কলিকাতা)। তারপর তিনি  লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়  হতে বিএসসি পাস করেন।  কলকাতায় ফিরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান করেন এবং সে কলেজে  পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপনা করেন। পরে তিনি সেই কলেজেই পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিলো বিস্তৃত: পদার্থবিদ্যা, জীবপদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও পুরাতত্ত্ব। বস্তুত, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ‍ a Bengali Polymath (he excelled at multiple fields of Arts and Science)।

জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানের বহুবিধ বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বিজ্ঞান গবেষণায় ভারতের অগ্রদূত।  যেসব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য তিনি বিশ্ববিখ্যাত হন তা হলো, ৫ মিলিমিটার তরঙ্গ, বেতার ও ক্রেসকোগ্রাফ।

বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যেও ছিলো জগদীশচন্দ্রের অবাধ বিচরণ। তার প্রকাশিত ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থটি এই প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ তার একটি অনবদ্য রচনা। ভাগীরথী গঙ্গা নদীর একটি ধারা। গঙ্গা নদী হিমালয় পর্বতশ্রেণীর নন্দদেবী গিরিশৃঙ্গের হিমশৈলে উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে ভাগীরথী ধারা বেয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। জগদীশচন্দ্র নদীর উৎপত্তি, তার গতিপথ, সাগরে পতন এবং তারপরেও জলের  নৈমত্তিক কাজ অতীব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। ভূগোল ও বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়কে তিনি তার রচনায় সুসংহত করেছেন, ছন্দোবদ্ধ করেছেন। তার সাবলীল লেখা নদীর স্রোতের মতই গতিময়। এই গতিময়তায় অবগাহন  করলে সমুদ্র স্নানের স্বাদ মেলে।

এই লেখাটি ১৮৯৫ সালে দাসী পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে পাঠে প্রীত হন এবং জগদীশচন্দ্রকে সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করেন। জগদীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ের বন্ধুত্ব ছিলো অতীব গভীর। তারা দুজনেই জীবদ্দশায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্বস্বীকৃতি লাভ করেন।  

অব্যক্ত বইটি সম্পর্কে সাধারণ তথ্য,
বই: অব্যক্ত, লেখক: শ্রীজগদীশচন্দ্র বসু, প্রথম প্রকাশক: বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, প্রকাশকাল: ১৩২৮সন/১৯২১ সাল। (Source: http://www.google.com.bd.abyakta+jagadishchandra+bose) পরবর্তীকালে বইটি প্রকাশ করেন বসুবিজ্ঞান মন্দির, ৯৩/১ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড, কলিকাতা-৭০০০০৯.  বইটির প্রচ্ছদের সর্ব উপরে লেখা, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, তার নীচে জগদীশচন্দ্রের ছবি। তা ছাড়া রয়েছে বসুবিজ্ঞান মন্দিরের দুটি চিহ্ন, প্রথমটি বজ্র চিহ্ন  আর দ্বিতীয়টি আমলকা চিহ্ন। (Source: www.bose institute.ernet.in/all/08 )

জগদীশচন্দ্রের এই গ্রন্থে বিজ্ঞান, সাহিত্য, কল্পবিজ্ঞান, বক্তৃতা ইত্যাদি নিয়ে মোট নিবন্ধের সংখ্যা ২১। এর ভেতর বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা-সাত, বক্তৃতা-সাত, সাহিত্য-ছয় ও কল্পবিজ্ঞান-এক। প্রথম নিবন্ধের নাম, ’যুক্তকর’, রচনাকাল ১৮৯৪ সাল। ১৮৯৫ সালে যে বছর তিনি ’ক্ষুদ্র তরঙ্গের সাহায্যে সংকেত প্রেরণের সম্ভাবনা’ শীর্ষক পরীক্ষাটি কলকাতা টাউন হলে প্রদর্শন করেন, সে বছর লেখাটি প্রকাশিত হয়।
    
 জগদীশচন্দ্রের প্রথম মুদ্রিত বই হচ্ছে ১৯০২ সালে প্রকাশিত `Response in the Living and Non-living.’’ প্রায় একই সময়ে উদ্ভিদ বিষয়ক তার গবেষণাপত্রটি ‘On the Electric Pulsation Accompanying Automatic Movement in Desmodium Gyrans’  বিলাতের Linn. Society কর্তৃক প্রকাশিত হয়। তার আর একটি গবেষণা গ্রন্থ ‘Plant Response as a means of Psychological Investigation’’ ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়।

১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘Comparative Electro-psychology’ ১৯২৩ সালে Physiology of the Ascent of Sap, ১৯২৪ সালে Physiology of Photosynthesis, ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়  Nervous Mechanism in Plants এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথকে।

উৎসর্গপত্রে তিনি লেখেন,  ‘To my life long friend Rabindranath Tagore. ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় Collected Physical Papers, ১৯২৮ সালে Motor Mechanism of Plants  এবং ১৯২৯ সালে Growth and Tropic Movement in Plants. বিলাতের বিখ্যাত Nature  পত্রিকায় তার ২৭টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। (Source: http://www. Google.com.bd. jagadish Chandra bose short biography).

উপরের বইগুলোর মধ্যে "On the Electric Pulsation Accompanying Automatic Movement in Desmodium Gyrans" বাদে অবশিষ্ট বইগুলো প্রকাশ করেছেন Longmans, Green & Co. London তাঁর Plant Autographs and Their Revelations বইটি The Macmillan Company, New York প্রকাশ করেন। (Source: www.vigyanprasar.gov.in./scriptscientist/JCBOSE.htm.)

তিনি Photograpy নিয়ে  গবেষণা করেন। বিলাতের জড়ুধষ Royal Photographic Society কর্তৃক আহুত হয়ে তিনি On a new theory of  Photographic action বিষয়ে বর্ক্তৃতা করেন। উপস্থিত সবাই তাঁর নতুন  তত্ত্বে বিস্মিত ও পুলকিত হন। আনন্দিত আবেগাপ্লুত জগদীশচন্দ্র  এই প্রসঙ্গে ১৯০২ সালের ২৭ জুন তারিখের  এক পত্রে লন্ডন হতে  রবীন্দ্রনাথকে যা লেখেন তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ‘..  ...  আমি সম্প্রতি বিনা আলোকে ছবি তুলিতে সমর্থ হইয়াছি। বন্ধু আমি এইসব নূতন নূতন তত্ত্বের সন্ধান পাইয়া বিহ্বল হইয়াছি। ইহার অন্ত কোথায়? মানুষের মন যে আর ধারণা করিতে পারে না। (পত্র নং ৪২)

উল্লেখ্য যে, অব্যক্ত হচ্ছে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তার একমাত্র গ্রন্থ। তার অধিকাংশ লেখা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবার আগে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়। উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হচ্ছে, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি প্রতিষ্ঠিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকা (এতে প্রকাশিত হয়, আকাশ স্পন্দন ও আকাশ-সম্ভব জগৎ), শিবনাথ শাস্ত্রী সম্পাদিত শিশুপত্রিকা ‘মুকুল’ (গাছের কথা, উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু, মন্ত্রের সাধন), মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ‘মোসলেম ভারত’ (অদৃশ্য আলোক), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত মাসিক পত্রিকা ‘দাসী’ (পলাতক তুফান, অগ্নিপরীক্ষা, ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রবাসী’ (বিজ্ঞানে সাহিত্য,  বোধন, আহত উদ্ভিদ, হাজির), ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা’ (নবীন ও প্রবীন), দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সম্পাদিত ’সচিত্র ভারতবর্ষ’ (রানী সন্দর্শন), ’নারায়ণ’, ’প্রবাসী’, ও ’সাহিত্য পত্রিকা’ (নিবেদন) ইত্যাদি।

অব্যক্ত গ্রন্থের শেষ রচনা ‘হাজির’। রচনাটি তার শেষ বয়সের লেখা (মৃত্যু ২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭)। এ রচনায় তার আত্ম-উপলদ্ধি ও জীবনদর্শনের পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। তার সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। (Source: http://www.hindu.com/thscript/print.pl.))

‘পলাতক তুফান’  গল্পটি রচিত হয় যখন তার বয়স ৩৮ (জন্ম ৩০ নভেম্বর, ১৮৫৮)। বিশেষ বিচারে গল্পটি সে সময়ে বিখ্যাত ছিলো, আজও বিশেষ।
এ গল্পের দুটি অংশ। প্রথম পরিচ্ছেদে ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখে সিমলা হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস: ‘বঙ্গোপসাগরে শীঘ্রই ঝড় হইবার সম্ভাবনা’। তারপর ২৮, ২৯, ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর তারিখে পর পর ধারাবাহিক পূর্বাভাস। শেষ পূর্বাভাসটি আসে ২ অক্টোবর তারিখে। তাতে ঘোষণা করা হয়, ‘কলিকাতায় ঝড় হইবার কথা ছিল, বোধ হয় উপসাগরের কূলে প্রতিহত হইয়া ঝড় অন্য অভিমুখে চলিয়া গিয়াছে। ঝড় কোন দিকে গিয়াছে তাহার অনুসন্ধানের জন্য দিক্-দিগন্তরে লোক প্রেরিত হইল, কিন্তু তাহার কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।’

এরূপ ভৌতিক কাণ্ডে বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিলাতের বিখ্যাত পত্রিকা Nature ফরাসি দেশের  La Nature,  মার্কিন পত্রিকা Scientific American অনেক লেখালেখি করেন। কিন্তু রহস্যের কোনো মীমাংসা হয়না। দেশীয় ইংরেজি পত্রিকা Englishman লিখলেন, এতদিনে বুঝা গেলো বিজ্ঞান সর্বৈব মিথ্যা।  Daily News, Pioneer, Civil and Military Gazette, Statesman  এর মতো বিখ্যাত সব পত্রিকা সিমলা হাওয়া অফিস বন্ধ করে দেবার জন্য তারস্বরে চিৎকার শুরু করে দেন। গণ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। সরকার বিপদের আশঙ্কা করেন। কারণ সম্প্রতি এক লাখ টাকা ব্যয়ে সিমলা হাওয়া অফিস স্থাপন করা হয়েছে, যন্ত্রপাতি সব নতুন। অফিস বন্ধ করে দিলে যন্ত্রপাতির কি হবে,  কে কিনবে কি কাজে লাগবে,  অফিসের বড় সাহেবের কি গতি হবে ইত্যাদি। নিরুপায় সরকার বায়ুর চাপ হ্রাস-বৃদ্ধিতে জনস্বাস্থ্যের উপর এর কি প্রভাব পড়ে তা জানার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। কারণ ৩০ সেপ্টেম্বর এক পূর্বাভাসে  বলা হয়ছিল যে, ‘আধ ঘন্টার মধ্যে Barometer  দুই ইঞ্চি নামিয়া গিয়াছে। আগামীকল্য ১০ ঘটিকার মধ্যে কলিকাতায় অতি প্রচণ্ড  ঝড় হইবে, এরূপ তুফান বহু বৎসর মধ্যে হয় নাই।’ এ কাজের দায়িত্বভার অধ্যক্ষ Medical College এর উপর অর্পণ করা হয়। এই বিষয়ে অধ্যক্ষ যা লেখেন তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

‘‘.. কলিকাতাবাসীরা আপাতত বহুবিধ চাপের নীচে আছে:

১ম চাপ বায়ু                                প্রতি বর্গইঞ্চে                   ১৫ পাউন্ড
২ চাপ ম্যালেরিয়া                          প্রতি বর্গইঞ্চে                   ২০ পাউন্ড
৩য় চাপ  পেটেন্ট ঔষধ                  প্রতি বর্গইঞ্চে                   ৩০ পাউন্ড
৪র্থ চাপ  ইউনিভার্সিটি                   প্রতি বর্গইঞ্চে                   ৫০ পাউন্ড
৫ম চাপ  ইনকাম ট্যাক্স                   প্রতি বর্গইঞ্চে                  ৮০ পাউন্ড
৬ষ্ঠ চাপ  মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স         প্রতি বর্গইঞ্চে                   ১ টন”

তাই এত চাপের মধ্যে বায়ুর চাপ দু এক ইঞ্চি বাড়লেই বা কি, কমলেই বা কি।

বিখ্যাত এক জার্মান বিজ্ঞানী পলাতক তুফান নিয়ে অতি পাণ্ডিত্যপূর্ণ এক রচনা লিখে বিশ্ব বিজ্ঞান সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।  দেশে দেশে তা নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। সে সব আলোচনায় বায়ুমণ্ডলের সৃষ্টি, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, আপেক্ষিক গুরুত্ব, অম্লজান-দ্ব্যম্লজান-উদ্জানের উৎপত্তি,আলফা-বিটা-গামা রে, থিওসোফিক্যাল সোসাইটি, ভূত, ভারতের পুরুষজাতি-নারীজাতি ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় নিয়ে  জ্ঞানগর্ভ সব আলোচনা হয়; কিন্তু তুফান কেন পালিয়ে গেলো সে রহস্যের কোনো মীমাংসা হলোনা।

গল্পের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে কেশ বিলাস তেল ‘কুন্তলীনের’ আশ্চর্য গুণের কথা বলা হয়েছে। কুন্তলীন প্রবর্তিত হয় ১৩০৩ বঙ্গাব্দে। সে বছরই প্রতিযোগিতায় ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ নামে একটি গল্প পাঠান জগদীশচন্দ্র।
স্বপ্নলব্ধ অবধৌতিক কুন্তলীনের গুণমাহাত্ম বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘.. ...পরে উক্ত  তৈল কুন্তল-কেশরী নামে জগৎ-বিখ্যাত হইয়াছে। তৈল প্রলেপে এক সপ্তাহের মধ্যে সিংহের লুপ্ত কেশর গজাইয়া উঠিল। কেশহীন মানব এবং তস্য ভার্যার পক্ষে উক্ত তৈলের শক্তি অমোঘ   ....’।

তার গল্পটি পুরস্কৃত হয়।

রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি ২৮ তারিখে সমুদ্রযাত্রা করেন। ১ তারিখ সকালে সমুদ্রে ঝড় শুরু হয়। প্রচণ্ড ঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে জাহাজের মাস্তুল, লাইফ-বোট সব ভেঙ্গে সমুদ্রের স্রোতে ভেসে চলে যায়। জাহাজ তখন মাঝ সমুদ্রে, ডুবু ডুবু অবস্থা। জাহাজের কাপ্তানের আশঙ্কা, যাত্রীদের আর্তনাদ ইত্যাদি সব মিলিয়ে জাহাজের ভেতর এক মৃত্যুভয়াল অবস্থা। সেই অন্তিমকালে তার ব্যাগের ভেতরে রাখা  কুন্তল কেশরী তেলের কথা মনে  পড়ে, আসার সময়ে তার কন্যা তাকে এক শিশি তেল দিয়েছিল।

এইসময়ে তার আরও মনে পড়ে, ‘‘ ...বৈজ্ঞানিক কাগজে ঢেউয়ের উপর তৈলের প্রভাব সম্প্রতি পড়িয়াছিলাম। তৈল যে চঞ্চল জলরাশিকে মসৃণ করে এ বিষয়ে অনেক ঘটনা মনে হইল।..”

অমনি আমার ব্যাগ হইতে তৈলের শিশি খুলিয়া অতি কষ্টে ডেকের উপর উঠিলাম। জাহাজ তখন টলমল করিতেছিল।

উপরে উঠিয়া দেখি, সাক্ষাৎ কৃতান্তসম পর্বতপ্রমাণ ফেনিল এক মহা ঊর্মি জাহাজ গ্রাস করিবার জন্য আসিতেছে।

আমি ‘জীব আশা পরিহরি’ সমুদ্র লক্ষ্য করিয়া ‘কুন্তল-কেশরী’ বাণ নিক্ষেপ  করিলাম। ছিপি খুলিয়া শিশি সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়াছিলাম। মুহূর্তমধ্যে তৈল সমুদ্রে ব্যাপ্ত হইয়াছিল। ইন্দ্রজালের প্রভাবের ন্যায় মুহূর্তমধ্যে সমুদ্র প্রশান্ত মূর্তি ধারণ করিল। কমনীয় তৈল স্পর্শে বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত শান্ত হইল। ক্ষণ পরেই সূর্য দেখা দিল।
এইরূপে আমরা নিশ্চিত মরণ হইতে উদ্ধার পাই।. .. ..কত সহস্র  প্রাণী যে এই সামান্য এক বোতল তৈলের প্রভাবে অকাল মৃত্যু হইতে রক্ষা পাইয়াছে, কে তাহার সংখ্যা করিবে?”

এই ঘটনার প্রায় ছয় মাস পড়ে Scientific American একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু তৈল রহস্যের কারণ জানা যায়নি। সব রহস্যের কারণ জানেন মাত্র একজন, তিনি স্বয়ং জগদীশচন্দ্র।

জগদীশচন্দ্র গল্পটি প্রথমে লেখেন ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ নামে। পরে অব্যক্ত গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার সময় শিরোনাম করা হয় ‘পলাতক তুফান বৈজ্ঞানিক  রহস্য।’ ‘পলাতক তুফান বৈজ্ঞানিক  রহস্য’ বাংলা সাহিত্যে  প্রথম কল্পবিজ্ঞান। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের জনক।
পলাতক তুফান  বৈজ্ঞানিক  রহস্য গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন বোধিসত্ত্ব চট্টোপাধ্যায়।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর ‘পলাতক তুফান’ গল্পটির  রূপ-রস-ভাষা ও কাহিনী মূল্যায়ন করে ‘বিজ্ঞান সাহিত্যিক জগদীশ চন্দ্র’ প্রবন্ধে সুজিতকুমার নাহা যথার্থই মন্তব্য করে বলেছিলেন, ..‘তার পলাতক তুফান’ গল্পটিই বাংলায় রচিত প্রথম কল্পবিজ্ঞান কাহিনী। বিজ্ঞান সুবাসিত এই গল্পটি একটি রসোত্তীর্ণ রচনা, বাংলা ভাষার এক অমূল্য সম্পদ।  (তথ্যসূত্র: জগদীশচন্দ্র বসু  রচনাসংগ্রহ, সম্পাদনা-অরূপরতন ভট্টাচার্য ও  শৈলেন চক্রবর্তী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৩)

তথ্যসূত্র: জগদীশচন্দ্র বসু  রচনাসংগ্রহ, সম্পাদনা-অরূপরতন ভট্টাচার্য ও  শৈলেন চক্রবর্তী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০১৩।

en. Wikipedia.org/wiki/jagadish_chandra_bose

লেখক: জ্যোতির্ময় বসু, সাবেক উপপরিচালক, বাপাউবো; লেখক ও গবেষক



ঢাকা, বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এস আর এই লেখাটি ৫৫০২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন