সর্বশেষ
রবিবার ১২ই আষাঢ় ১৪২৯ | ২৬ জুন ২০২২

যে কারণে হারিয়ে গেলেন পথিক নবী

রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০১৫

514968320_1445778000.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
'আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ'। কেউ জানুক আর নাই জানুক। পথিক নবীর সেই নদীটি কিন্তু এখন আর নেই। নদীটি আকারে আরো বড় হয়ে সাগরে রুপ নিয়েছে। হ্যাঁ পাঠক ঠিকই শুনছেন, জনপ্রিয় এই গায়কের নদী গানটি এখনো মন সাগরে আছে। অর্থাৎ দীর্ঘ নয় বছর তিনি মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন। এই নয় বছরে তার কোন গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছায় নি। তাতে কি? তিনি নিরলসভাবে, নিমগ্ন চিত্তে সঙ্গীতের সাধনা করে গেছেন এ ক’বছর। প্রায় তিন চারশো গান নিজে লিখেছেন, সুর করেছেন। রেকর্ড করেছেন প্রায় ৪০/৫০টি গান। সেই গান নিয়ে যে কোন সময়েই আবার নতুনভাবে হাজির হয়ে যাবেন । এমন কথাই জানালেন পথিক। এই দীর্ঘ সময়ের গান নিয়ে তার ভাবনা ও তার লিখিত উপন্যাস নিয়ে কথা বলেছেন একটি অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে। আসুন জেনে নিই এই কথপোকথন।

প্রশ্ন: গানের জগতে আপনার শুরুটা হয়েছিল কিভাবে?

পথিক নবী: অনেক ছোটবেলা থেকেই আমি গান করি। আমার মায়ের পরিবারের সবাই গান করেতো। বৃহস্পতিবার নানা বাড়িতে আধ্যাতিক গানের চর্চা হতো। মামারাও গান করতেন। আমি তখন থেকেই তবলা বাজাতাম, গান করতাম। এরপর ৯০ এর গণ আন্দোলনের সময় আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি এরিয়ায় প্রবেশ করি। তখন শাহবাগের বিভিন্ন আড্ডায় শিল্পীদের আনাগোনা ছিল। কোথাও কেউ বসে ছবি আকঁছেন, কেউ গান করছেন, ছবি তুলছেন। একটা শৈল্পিক চর্চা ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটিকে ঘিরে। এই সময়টা এসব দেখে আমার মানসিক অনেক পরিবর্তন হয়। আমি এক নতুন জগতের সন্ধান পাই। সেখান থেকেই মূলত আমার গানের জীবন শুরু হয়। আমি তখন বাড়ি থেকে পন নিয়ে বের হয়ে এসেছি, যে মরে যাব কিন্তু শিল্পী হবো, গান আমি ছাড়বো না। ৯২ সালে 'আমার একটা নদী ছিল' গানটি লিখি। তা ২০০২ সালে ইত্যাদী অনুষ্ঠানে প্রচার হয় তারপরই সবাই আমাকে চিনতে শুরু করে।

প্রশ্ন: এরপর আপনি কতগুলো কাজ করলেন? কতগুলো অ্যালবাম করেছিলেন? কতদিন পর্যন্ত এই মিডিয়ায় গান গাইলেন?

পথিক নবী: এরপর আমি ২০০৫ পর্যন্ত অনেক গান করি। প্রায় ৩০/৩৫টা অ্যালবাম করি। অনেকগুলো গান হিটও হয়।

প্রশ্ন: কিন্তু এরপরই হঠাৎ করে ডুব দিলেন কেনো? মানে এই দীর্ঘ নয় বছর আপনার শ্রোতারা আপনার গান থেকে দূরে ছিল...

পথিক নবী: আমি হঠাৎ করেই খ্যাতি পাই। এই খ্যাতির জন্য তখন প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু মানুষ তখন আমাকে কাজের জন্য ডাকা শুরু করলো। তিন/চার বছরে অনেক কাজ করে আমি হাপিয়ে উঠলাম। কিন্তু তার আগে আবার আমি প্রায় ১০/১২ বছর শরীরের সঙ্গে অনিয়ম করেছিলাম। আবার সবাই চিনে যাওয়ার পর অনেক কাজ করে হাপিয়ে উঠলাম। সব মিলিয়ে আমি শারীরিকভাবে প্রায় ভেঙে পরেছিলাম। এছাড়া তখন আমি মিউজিক কম্পোজ করতে পারতাম না। আমার মনে হচ্ছিল আমি অনেক কিছু বুঝছি না। এইসব কারণে আমি নিজেরে জগতে চলে যাই। নিজেকে চিনতেই আমার এই যাত্রা। আমি আসলে নিজেকে যেভাবে শ্রোতাদের সামনে প্রেজেন্টেশন করতে চাচ্ছিলাম সেভাবে পারছিলাম না। এই সব কারণেই নিজের জগতে গিয়ে কাজ করার মনস্থির করি। নিজের মিউজিক সেন্স গ্রো করার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: তার মানে আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে, কিছু বুঝে উঠার আগেই আপনার খ্যাতি চলে আসছিলো, যার জন্য আপনি প্রস্তুত ছিলেন না। খ্যাতিই কি আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হলো?

পথিক নবী: অনেকটা এরকম। তবে এই কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার কোন ক্ষতি হয়নি। বরং আমি নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছি। আর তাছাড়া আমি যখন একটু দূরে চেপে যাই তখন অডিও ইন্ডাষ্ট্রিতেও অস্থিরতা শুরু হয়েছিলো। ক্যাসেট ফিতার যুগের সর্ব শেষ কয়েকজনের মধ্যে আমিও ছিলাম। আরো অনেকেই ছিল। তখন ইন্টারনেট জনপ্রিয় হয়, প্রযুক্তি নতুনভাবে আসতে শুরু করে।। ফলে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ধস নামে।

প্রশ্ন: তাহলে কি ইন্টারনেট আসার কারণে আপনাদের ক্ষতি হলো?

পথিক নবী: না, এটা আমি মনে করি না। ইন্টারনেট বা প্রযুক্তির কারণে অডিও ক্যাসেট শিল্পের ধস নামলেও আবার আরেকটা উপকার হয়েছে, এখন আমাদের গান পৃথিবীব্যাপীই পৌঁছে যাওয়ার সুব্যবস্থা হয়েছে। এটা অনেক ভালো দিক। আগে একটা গান রেকর্ড করার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। এখন প্রত্যেক শিল্পীরই নিজস্ব স্টুডিও আছে। আমি বলবো সব মিলিয়ে আরো অনেক ভাল হয়েছে।

প্রশ্ন: আচ্ছা। এই ক’বছরে আপনি কি করলেন?

পথিক নবী: সেই সময়টায় আমি অনেক কিছু বুঝতাম না। কিন্তু পন করি আমাকে সব বুঝতে হবে। আমি মিউজিক কম্পোজের সামনে ইঞ্জিনিয়ারের সামনে চুপচাপ বসে থাকতাম। ভাবতাম, দেখতাম। এখন আমি সব পারি বলবো না, কিন্তু পারি। নিজের গানগুলোকে নিজে রেকর্ড করতে পারি। একটা জেদ কাজ করেছিলো যে আমি সব শিখবো। আমি শিখেছি। কয়েকশ গান লিখেছি, ৪০/৫০টা গান রেকর্ড করেছি। নিজেকে চিনেছি। নিজের জীবন নিয়ে শাহবাগ, পিজি এই চারপাশের আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে একটি উপন্যাস লিখেছি। অর্থাৎ মিডিয়া থেকে ডিটাচ থাকলেও নিজের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করেছি।

প্রশ্ন: এখন কি তাহলে আপনি নিজেকে চিনতে পেরেছেন? নিজেকে আবিস্কার করতে পেরেছেন?

পথিক নবী: হ্যাঁ, আমি দীর্ঘ সময় পেয়েছি নিজেকে নিয়ে ভাবার বুঝার। কি চাই সেটা ঠিক করতে পেরেছি। এই ক’বছর ধৈর্য্য ধরেছি। সব মিলিয়ে অনেক ভালো আছি। নিজের অনেক উন্নতি হয়েছে। আমি যেসব বুঝতাম না সেগুলো এখন বুঝি। আমার আগের গান যা মানুষকে ভাবাতো। আমি মনে করি, আমার এখনকার কথা, গান মানুষের আরো অনেক গভীরে যাবে।

প্রশ্ন: এখন দিন কাটে কিভাবে? সারাদিন কি করেন?

পথিক নবী: গান শুনি, লিখি, ব্যায়াম করি। পরিবার, বাচ্চার সঙ্গে সময় দেই। বন্ধুদের সঙ্গে সময় দেই। সিনেমা দেখি। উপন্যাস, গল্প লিখি।

প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসের বিষয়বস্তু কি?

পথিক নবী: আমি জীবনকে যে বিচিত্রভাবে দেখেছি, তাই টুকরো টুকরো গল্পে, উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে বিভিন্ন গান হচ্ছে। এই সম্পর্কে কিছু বলুন...

পথিক নবী: এখন আমরা অনেক আন্তর্জাতিক মানের ইন্সট্রূমেন্ট, টেকনোলজি ব্যবহার করছি। কিন্তু সেই লেভেলের কোন গান তৈরি করতে পারছি না। এটা খারাপ দিক। সেই রকম বলিষ্ঠ কোন প্রেজেন্টেশন নেই বলতে গেলে।

প্রশ্ন: আপনি নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। এখানো কি কোন প্রস্তাব পেলে করবেন?

পথিক নবী: হ্যাঁ, অবশ্যই করবো। যদি পরিবেশ পরিস্থিতি ঠিক থাকে আমাকে কারো প্রয়োজন হয় কেন করবো না?

প্রশ্ন: কথা ও সুর নিয়ে একটা প্রচলিত বিতর্ক আছে? এই দুটোর মধ্যে কোনটার শক্তি বেশি বা আগে?

পথিক নবী: এই দেশে আমরা যেহেতু বাণী প্রধান গান করি। সেই ক্ষেত্রে বাণীটা জরুরি। তবে বাণীর মধ্যেও একটা সুর থাকে। আবার সুরের মধ্যেও একটা বাণী তৈরি হয়। আবার কথা ও সুরের বাইরেও শুধু ইন্সট্রূমেন্টের বাজনার মধ্যেও একটা কথা তৈর হয়। আর এগুলো সব কিছুর কম্বিনেশন করাটাই একজন মিউজিশিয়ানের কাজ। একটি দূর্বল হলে পুরো জিনিসটাই ভেস্তে যেতে পারে।

প্রশ্ন: একজন গায়ক যখন একজন গীতিকবির কাছ থেকে কথা নেন। তখন কি সে তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেন না?

পথিক নবী: যদি প্রতিশ্রূতিশীল গীতিকার, সুরকার বা গায়ক হয় তবে কারো উপরই কেউ নির্ভরশীল হবে না। যে যার কাজটা ঠিক মতো করলেই কোন সমস্যা নেই। এখানে নির্ভরশীলতার প্রশ্নই উঠবে না।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি?

পথিক নবী: ভবিষ্যত নিয়ে কোন পরিকল্পনা নেই। ভবিষ্যতের কাজ ভভিষ্যতের উপরই ছেড়ে দিয়েছি। ভবিষ্যতই নাহয় ভবিষ্যত ঠিক করুক।

প্রশ্ন: নতুন যারা এই সেক্টরে কাজ করেত চায় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?

পথিক নবী: অবশ্যই তারা যেন ভালোভাবে জেনে বুঝে নিজেকে তৈরি করে আসে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

পথিক নবী: আপনাকেও ধন্যবাদ। প্রিয়.কম

ঢাকা, রবিবার, অক্টোবর ২৫, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এম এস এই লেখাটি ১২১০৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন